বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে প্রথম হয়েও সানিয়াত এখন জাবি অধ্যাপক!


চ্যানেল আই অনলাইন
Published: 2017-12-07 21:12:43 BdST | Updated: 2017-12-14 08:11:11 BdST

বর্তমানে তরুণ সমাজের কাছে স্বপ্নের চাকরি বিসিএস, দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যার পেছনে ছুটে চলা সেই বিসিএসে প্রথম হয়েও যোগ দেননি তিনি। বিসিএস নামক সোনার হরিণটি ধরা দিলেও সেখানে কাজে যোগ না দিয়ে হয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সাহিত্যে জাপানে মনবুশো স্কলারশিপ পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। অল্প বয়সেই হয়েছেন বিভাগীয় প্রধান, লাগিয়েছেন অধ্যাপক হবার তকমা। তিনি অধ্যাপক ড. সানিয়াত সাত্তার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক।

প্রচারবিমুখ নিভৃতচারি এ মানুষটি লেখালেখিতে সিদ্ধহস্ত। গল্প লিখে পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। পছন্দ করেন মিউজিক। আর তাই নিজের বাড়িতেই গড়ে তুলেছেন মিউজিকের এক আলাদা ভূবন। ছবি আঁকায় সিদ্ধহস্ত পারফেকশনিস্ট এ মানুষটি নিখুঁতভাবে করতে পছন্দ করেন সব। বিভাগের অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষক তিনি। একান্ত সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ড. সানিয়াত সাত্তার জানিয়েছেন জীবনের কথা। দিয়েছেন তরুণদের জন্য দিক নির্দেশনা।

আদতে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম বলতে যেমন বোঝায় ঠিক তেনটাই ঘটেছে সানিয়াতের ক্ষেত্রে। সানিয়াতের বাবা অধ্যাপক ড. এম এ সাত্তার ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। আর মা অধ্যাপক ড. আফরোজা সাত্তার ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ। দুই ভাইবোনের মধ্যে সানিয়াত বড়। ছোট বোন ডা. ক্লারা সালমিন সাত্তার চিকিৎসক।

রাজধানী ঢাকায় জন্ম হলেও মাত্র ৬ মাস বয়সেই মা-বাবার সঙ্গে চলে যেতে হয় ফিনল্যান্ডে। সানিয়াতের বাবা-মা সেখানে গিয়েছিলেন পিএইচডি করতে। সানিয়াতের মধুর শৈশব স্মৃতি বলতে যা বোঝায় তার পুরোটাই ফিনল্যান্ডের।

১০ বছর বয়সে বাংলাদেশে ফিরে ঘোর বিপদে পড়ে যান ছোট্ট শিশু সানিয়াত। ইংরেজি ও ফিনিশ ভাষায় কথা শেখা সানিয়াত বাংলা বলতে না পারায় স্কুলে ভর্তি করা হলে অন্যান্য শিশুদের সঙ্গে ভাববিনিময় করতে পারতেন না। যা বলতেন তাতেই হাসাহাসি করতো সানিয়াতের সহপাঠীরা। বিচ্ছিন্ন, বিষণ্ণ, একা সানিয়াতের স্কুল জীবনের স্মৃতিটা তাই মোটেও সুখকর ছিল না।

সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন রংপুর ক্যাডেট কলেজে। সেখানেও পরির্তন হয় না পটভূমির। ভাষাগত বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয় সেখানেও। এরই মাঝে ১৯৯৪ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি ও ১৯৯৬ সালে স্টার মার্কস নিয়ে এইচএসসি পাশ করেন। এরপর ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্য বিভাগে। ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়েই ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন সানিয়াত। সেই সঙ্গে ছোট থেকেই সাহিত্যানুরাগী হওয়ায় তখনই সিদ্ধান্ত নেন সেখানেই তাকে পড়তে হবে। সেজন্য আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগে পড়ার সুযোগ পেয়েও যাননা তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর সানিয়াতের জীবনে আসে বিশাল পরিবর্তন। সেসময় অনেক বন্ধু গড়ে ওঠে তার। আর তার ভাষাগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে কোনই সমস্যা ছিল না তাদের। ছোট থেকেই সাহিত্যানুরাগী সানিয়াত পড়াশোনা করতে ভীষণ ভালবাসতেন। আর তাই বিভাগে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

মাস্টার্সে অধ্যয়নকালে জারি হয় বিসিএসের প্রজ্ঞাপন। বন্ধু-বান্ধব সহ সহপাঠীদের সবাইকে বিসিএস দিতে দেখে আগ্রহী হন সানিয়াত। তবে বিভাগের পড়ায় বেশি মনোযোগী হওয়ায় অন্যদের মত প্রস্তুতি নিতে পারেননি তিনি। তা সত্ত্বেও বেসিক অনেক বেশি শক্তিশালী হওয়াতে বিসিএস নামক কঠিন পরীক্ষার বৈতরণী পার হতে বেগ পেতে হয়নি তাকে।

তবে বিসিএসের ফল প্রকাশের মাস দু’য়েক আগেই সানিয়াত নিয়োগ পান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার পদে। পরিবারের অনেকে শিক্ষক হওয়ায় সানিয়াতের রক্তের ভেতরই যেন ছিল শিক্ষক হবার এক অদম্য আকাঙ্খা।

২৪ তম বিসিএসের ফল প্রকাশের পর প্রশাসন ক্যাডারে নিজের নামটি সবার প্রথমে দেখতে পান সানিয়াত। সেদিন ভীষণ ভাললেগেছিলো তার। শুধু অভিজ্ঞতা অর্জন করতে যে পরীক্ষায় অংশ নেয়া সেখানে প্রথম হওয়াটাকে জীবনের অন্যতম সুন্দর অভিজ্ঞতা বলেই উল্লেখ করেন মেধাবী এ অধ্যাপক। সেসময় চারপাশের সবাই প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিতে বললেও সানিয়াত নিজের সিদ্ধান্তেই থাকেন অনড়।

১৩ বছরের শিক্ষকতা জীবনের শুরু ২০০৪ সালে। তিন বছর লেকচারার থাকার পর জাপানে যান পিএইচডি করতে। সেখান থেকে ৫ বছর পর ফিরে ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান পদে উন্নীত হন। এরই মাঝে সহকারি অধ্যাপক থেকে হন সহযোগী অধ্যাপক। ৩ বছর বিভাগীয় প্রধান থাকার পর ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে যান পোস্ট ডক্টরেট করতে। সেখান থেকে ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জনের পর প্রফেসর পদে পদায়ন করা হয় তাকে। মাত্র ৩৬ বছর বয়সেই অধ্যাপক হন তিনি।

অধ্যাপক ড. সানিয়াত সাত্তার

 

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সাহিত্যে মুনবুশো স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পাওয়ায় জাপানের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত সানিয়াতকে বলেছিলেন: প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এ গৌরব অর্জন করেছ তুমি। কেমন লাগছে তোমার? উত্তরে সানিয়াত বলেছিলেন: আমার মনে হচ্ছে আমি খুব বিখ্যাত হয়ে যাবো। তার এ উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে বোর্ডে উপস্থিত সকলেই তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। এ স্মৃতিটা ভীষণ সুখকর তার।

তরুণদের উদ্দেশ্যে সানিয়াত বলেন: সে কাজটিই করতে হবে আমি যেটা পারবো বলে জানি। অার সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পরিশ্রম ও মেধা দিয়ে কাজটি করার পরামর্শ দিয়েছেন সানিয়াত।

জীবনে শুধু নম্বর প্রাপ্তির জন্য পড়লে সফলতা অসম্ভব উল্লেখ করে এই অধ্যাপক বলেন: ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা শুরুই করে স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা নিয়ে। আর সেটিই তারা বয়ে বেড়ায় বছরের পর বছর।

সানিয়াত বলেন: কোন বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিষ্ঠান, বা কোন সাবজেক্টকে ছোট করে দেখার কোন অবকাশ নেই। যে যেই অবস্থানে অাছে সেখান থেকেই ভাল করা সম্ভব। আমরা শুরুটাই করি বৈষম্য দিয়ে, তাই আমাদের ‍উন্নয়নের গতিটাও অনেক ধীর। যে যেখানে পড়ছে, যা পড়ছে সেটাই যদি ভালভাবে পড়ে তাহলেই বিসিএস, ব্যাংক কিংবা চাকরির পরীক্ষা সব জায়গাতেই ভালো করা সম্ভব।

নিজের পঠিত বিষয়কে অবহেলা করে অন্য বিষয়ের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়ে সফলতা অর্জন কঠিন বলে মনে করেন তিনি। পড়াটা শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য না পড়ে অনুরাগ নিয়ে পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন সানিয়াত।

সানিয়াত বিশ্বাস করেন, জীবনে সফলতার মূলমন্ত্রই হল আত্মতৃপ্ত থাকা। নিজের যা আছে, সে ছোট হোক বা বড় হোক, তাতে তৃপ্ত থাকলে জীবনে সব চাওয়া পূরন করা সম্ভব। সূত্র: চ্যানেল আই অনলাইন।

এইচএম/ ০৭ ডিসেম্বর ২০১৭

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।