ঢাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগ


টাইমস প্রতিবেদক
Published: 2018-01-16 10:24:38 BdST | Updated: 2018-08-20 22:47:21 BdST

সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। এসময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর মাধ্যমে আন্দোলনকারী ছাত্রীদের কটুক্তি করার ভিডিওচিত্র ধারণ করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সংবাদকর্মীও লাঞ্ছিত হয়েছেন।

সোমবার (১৫ জানুয়ারি) বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের উপাচার্য অফিসের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, কয়েকদিন ধরে সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়েছিলেন উপাচার্য অফিসের সামনে। সেখানে ছেলেরা দাড়িয়ে ও মেয়েরা বৃত্তাকারে বসে আন্দোলনের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে সেখানে আসেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি আবিদ আল হাসান, সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্সসহ কেন্দ্রীয় ও হল শাখার নেতাকর্মীরা। পরে সোহাগ ও জাকির উপাচার্য অফিসে প্রবেশ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এসময় বিভিন্ন হলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তারা শিক্ষার্থীদের দাবির ব্যাপারে উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলার জন্য শিক্ষার্থীদের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল চাইলে শিক্ষার্থীরা তাতে অসম্মতি জানিয়ে উপাচার্যকে এসে তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য অনুরোধ করেন। এসময় হল নেতাদের আরো কর্মী আনার নির্দেশ দিয়ে উপাচার্য অফিসে ঢুকে যান ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক।

হলের নেতাকর্মীরা আসার পর আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে অভিনব কৌশল নেয় হলের নেতারা। কেউ অবস্থানকারীদের ওপর হামলা করেননি। হলগুলোর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের নেতৃত্বে কয়েক শ নেতা-কর্মী আন্দোলনকারীদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। পাশে মল চত্বরে চলে দফায় দফায় মহড়া। প্রথমে হলের নেতারা নিজ নিজ হলের শিক্ষার্থীদের সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। শেষ পর্যন্ত সেখানে ৩০-৪০ জন ছাত্রীসহ ৫০-৬০ জন অবস্থান করছিলেন। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা গোল হয়ে তাঁদের ঘিরে ধীরে ধীরে এগোতে থাকেন। ছাত্রীদের উদ্দেশ্য করে নিজেদের মধ্যে অশ্লীল কথা বলছিলেন কেউ কেউ। তাদের এই আচরণে মেয়েরা টিকতে না পেরে একে একে চলে যেতে থাকে। ধীরে ধীরে আন্দোলনকারীদের সংখ্যা কমতে থাকলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আরো কাছে এসে তাদের ঘিরে ধরে। এসময় তারা ছেলেদেরকেও মারধরের হুমকি দিতে থাকে। একপর্যায়ে ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি বেনজীর হোসেন নিশি, রোকেয়া হল শাখার সভাপতি বি এম লিপি আক্তার, কুয়েত মৈত্রী হল শাখার সভাপতি ফরিদা পারভীন ও সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী শায়লা, সুফিয়া কামাল হলের সাধারণ সম্পাদক সারজিয়া শম্পার নেতৃত্বে একদল কর্মীরা মেয়ে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করে। এসময় সাংবাদিকরা এই দৃশ্যের ছবি নিতে গেলে ছাত্রলীগের কর্মীরা সাংবাদিকদের উপর হামলা করে। এসময় তাদের ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে ভাঙচুর করে।

এর আগে এই আন্দোলনের সমন্বয়ক মশিউর রহমান সাদিককে মুখ চেপে ধরে মারতে মারতে উপাচার্যের অফিসে ঢোকান ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী। পরে অফিসের ভিতরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাকে মারধরের হুমকি দেয় ও তার সঙ্গে থাকা মোবাইল, মানিব্যাগ কেড়ে নেয়। এরপর তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আবিদ আল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।

এ ঘটনার পরেও বাইরে কয়েকজন ছাত্রী অবস্থান করছিলেন। তবে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের উত্ত্যক্তের শিকার হয়ে দু-একজন করে উঠে যাচ্ছিলেন। ছাত্রলীগের নেতারা তাঁদের সরে যাওয়ার রাস্তা করে দিয়ে গালাগাল করছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনজন ছাত্রীকে ব্যানার নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। ওই সময় ছাত্রলীগের হল পর্যায়ের কয়েকজন নেত্রী সেখানে গিয়ে তাঁদের চলে যেতে বলেন। পরে তাঁরাও চলে যান।

জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। যদি কেউ করে থাকেন, কারও কাছে প্রমাণ থাকে, তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা এসেছি উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলার জন্য। আমরা সমাধান চাই। আমরা যারা এসেছি, সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সবাই প্রশাসনিক ভবনে যার যার কাজে এসেছে। আন্দোলনকারীদের ওখানে ছাত্রলীগের কেউ ছিল না।’

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীরাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে। এরপর থেকে অধিভুক্তদের কোনো কাজ এখানে করা হবে না। তাদের যেকোনো একটা কলেজে এই কাজ সম্পন্ন করা হবে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কি কথা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন ছাত্রলীগের নেতারা এই আন্দোলনের পরিস্থিতি জানতে এসেছিলো।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাপ কমানোর অংশ হিসেবে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। এরপর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ফেসবুকে এর বিরোধিতা শুরু করে। ফেসবুকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ গ্রুপে একটি ইভেন্ট খোলা হয়। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

এইচজেড/ ১৬ জানুয়ারি ২০১৮

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।