তরুণের মরদেহ সমাহিত করার যাবতীয় সকল খরচ বহন করবে ফিন্যান্স বিভাগ

ঢাবি ফিন্যান্সের ছাত্র তরুণের আত্মহনন নিয়ে শিক্ষার্থীদের নানান প্রশ্ন 


এন এইচ সাজ্জাদ, ঢাকাটাইমস
Published: 2018-02-15 15:17:48 BdST | Updated: 2018-09-25 10:11:19 BdST

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের ছাত্র তরুণ হোসাইনের আত্মহত্যার কারণ হতাশা- বিষয়টি গণমাধ্যম এসেছে এভাবেই। তার সহপাঠী আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও সেভাবেই বলছে। কিন্তু এই বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামনেই দাঁড় করিয়েছে একটি প্রশ্ন।

ছেলেটি হতাশ হয়ে পড়ছিল, এই বিষয়টি জানতেন বন্ধুরা, টের পাওয়ার কথা শিক্ষকদেরও। আর জানার পর তাকে কাউন্সেলিং (পরামর্শদান) করার জন্য বিভাগের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি কোন উদ্যোগ। অথচ ছাত্রদের কাউন্সেলিং করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে আছে কাউন্সেলিং সেন্টার।

তরুণ এক ধরনের মানসিক নির্াতনের শিকার হয়েছেন কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। কুষ্টিয়ার গ্রাম এলাকায় নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেটি পড়াশোনায় ছোটবেলা থেকেই অন্যদেরকে ছাড়িয়ে। কিন্তু শহুরে স্মার্টনেস আত্তস্থ করা হয়নি সেভাবে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্য বিভাগের ফিনান্স বিভাগে ভর্তির পর এখানেই ভুগেছেন তিনি।

কোন এক কোর্সের প্রেজেনটেশনের (উপস্থাপনা) সময় অন্যদের মত চটপটে ইংরেজি বলতে না পারায় শিক্ষকের উপস্থিতিতে তরুণকে পড়তে হয়েছিল বিব্রতকর পরিস্থিতিতে।

ফিন্যান্স বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেছেন, ‘তার আত্মহত্যার প্রধানতম কারণ হল বিভাগের চাপ। কারণ প্রথম বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের একটা কোর্সে বার বার মানোন্নয়ন দেওয়া সত্ত্বেও তার ফলাফল ভাল হচ্ছিল না।’

তরুণ তার বন্ধুদেরকে বিভাগ থেকে পাস করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে সংশয়ের কথা বলতেন। যদি ড্রপ আউট হয়ে যায় তাহলে কী করবেন, সে কথাটাও তুলতেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলের ১০৭ নম্বর কক্ষ, যেটাকে হলের সবাই গণরুম হিসেবে চেনেন, সেখানেইে গাদাগাদি করে থাকতেন তরুণ হোসাইন।

হলের বেশ কয়েকজন ছাত্র বলেন, তরুণ সবসময় হতাশায় ভুগতেন, গণরুমে তার বন্ধুরা নানা সময় বিভিন্নভাবে তাকে উপহাস করতেন।

তরুণের সহপাঠীরা তার মৃত্যুর জন্য দায়ী করছেন ফিন্যান্স বিভাগ ও হলের গণরুমে তাকে ঘিরে উপহাস ও সহপাঠীদের অবহেলাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লোজড ফেসবুক গ্রুপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারেও তরুণকে নিয়ে পোস্ট করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

তরুণের বন্ধু এম এস আই খান এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘গণরুমে 'তরুণ' (তরুণ হোসেন) ছিল সবচেয়ে নিরীহ একটি ছেলে। শৈশবর মা হারা অযত্নে বড় হওয়া এই ছেলেটি ২০১৫-১৬ সেশনে ভর্তি হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিনান্সে বিভাগে। অর্থিক সংকটে জর্জরিত ছেলেটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে নানা কারণে চরম হতাশায় ভূগতে শুরু করে। তার শারীরিক গঠন ও দেহের কালো রঙের কারণে অনেকের কাছেই সে যেন একটু বেশিই নিগৃহীত হত। কিন্তু আমি জানতাম ছেলেটা কতটা মেধাবী, কতটা সংগ্রামী।’

সহপাঠীরা জানান, তরুণ ফিন্যান্স বিভাগ পাল্টে অন্য বিভাগে যেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন শিবলী রুবায়েতুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কিন্তু তিনি তাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে বলেছিলেন।

তরুণের হলের শিক্ষার্থী সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র গোলাম রাব্বানী রনজু বলেন, ‘ছেলেটি খুব মেধাবী ছিল। সে ২০১৩ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় কুষ্টিয়া জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিল এবং তার ইচ্ছা ছিল পররাষ্ট্র ক্যাডার হওয়ার। তাই সে প্রথম বর্ষ থেকেই বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বিসিএস পরীক্ষার এমন কোন ক্যাটাগরি ছিল না যে সে জানত না।’

তরুণের মৃত্যু তার বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে কোনো ভাবান্তর তৈরি করেনি বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

তরুণের এক বন্ধু জানান, সকালে বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পর্ায়ের থেকে পাচঁজন শিক্ষক মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে সব ছাত্রকে নিষেধ করে এসছেন কেউ যাতে মিডিয়ায় বিভাগের নাম না বলে। এই ভয়ে মুখ খুলেননি কেউ ।

এই ঘটনায় বিভাগের শিক্ষকরা কোনো শোকও প্রকাশ করেননি। অন্যান্য দিনের মতো আজও স্বাভাবিক ছিল বিভাগের কার্্রক্রম।

ফিন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান কিসমাতুল আহসান বক্তব্য নিতে একাধিকবার চেষ্টা করেও পারা যায়নি। তবে বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, তরুণের মরদেহ সমাহিত করার যাবতীয় সকল খরচ বহন করবে ফিন্যান্স বিভাগ।

বুধবার দুপুরে হাজারীবাগের সেকশন এলাকায় বেড়িবাঁধের কলার আড়তের পাশে নির্মাণাধীন একটি মসজিদের পাশ থেকে তরুণের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তার পকেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র পেয়ে পুলিশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রব্বানীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তরুণের পরিচয়ের বিষয়ে নিশ্চিত হয়। আর খবর দেয়া হয় তার পরিবারকে।

ঢাকাটাইমস থেকে নেয়া

বিডিবিএস 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।