পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন মিলছে না ভার্চুয়াল ক্লাসরুমের সুফল?


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-05-21 10:01:13 BdST | Updated: 2018-08-16 14:21:51 BdST

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষা-গবেষণা আদান-প্রদানের উদ্দেশ্যে ২০১৩ সালে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শেকৃবি) প্রতিষ্ঠা করা হয় প্রযুক্তিনির্ভর একটি ‘ভার্চুয়াল ক্লাসরুম’। যদিও প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরেও লক্ষ্য রয়ে গেছে অধরাই। ভার্চুয়াল এ ক্লাসরুমের মাধ্যমে কোনো ক্লাসই এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি।

দেশের অন্য সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত ভার্চুয়াল ক্লাসরুমেও কার্যত কোনো ক্লাস হয় না। ব্যবহার যা হয় তা মূলত সভা, সেমিনার কিংবা সংবাদ সম্মেলন, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সঙ্গে।

শিক্ষা-গবেষণা কার্যক্রম বিনিময়ের অত্যাধুনিক অবকাঠামো ‘ভার্চুয়াল ক্লাসরুম’। এ শ্রেণীকক্ষে বসে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশের অন্য যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ক্লাসে অংশ নেয়ার সুযোগ পান। একইভাবে দেশের শিক্ষকরাও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে পারেন। আধুনিক এ শিক্ষণ পদ্ধতির সুফল কাজে লাগাতে দেশের ৩৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ভার্চুয়াল ক্লাসরুম’ প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। যদিও বাংলাদেশ শিক্ষা ও গবেষণা নেটওয়ার্ক (বিডিরেন) প্রকল্পের মাধ্যমে করা এসব অবকাঠামোর সুফল পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা।

ভার্চুয়াল ক্লাসরুম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মামুনুর রশিদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ভার্চুয়াল ক্লাসরুম ব্যবহার না হওয়ার অন্যতম কারণ প্রচারণার অভাব। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ‘ভার্চুয়াল ক্লাসরুম’ আছে, তা ওখানকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই ঠিকমতো জানেন না। আরেকটি সমস্যা হলো— ভার্চুয়াল ক্লাসরুম ব্যবহারের নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। যেমন ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কোর্স পড়াবেন। তাহলে ওই কোর্সের পরীক্ষা ও ফলাফল প্রক্রিয়া বিষয়ে কোনো ধরনের নীতিমালা প্রচলিত ব্যবস্থায় নেই। তাই ভার্চুয়াল ক্লাসরুম বিষয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি ও এটি পরিচালনায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করা গেলে এর সুফল মিলবে।

বিডিরেনের আওতায় ২০১৭ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদের (প্রথম বিজ্ঞান ভবন) দ্বিতীয় তলায় প্রতিষ্ঠা করা হয় ভার্চুয়াল ক্লাসরুম। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত এখানে আন্তর্জাতিক ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রতি মাসে দুয়েকটা ক্লাস হলেও তা দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাকি সময় অব্যবহূতই থাকছে ব্যয়বহুল এ অবকাঠামো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভার্চুয়াল ক্লাসরুম প্রতিষ্ঠা করা হলেও তার সুফল থেকে আমরা বঞ্চিত। আমাদের ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে কোনো ক্লাস হয় না, এটি এক ধরনের শোপিস। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপকদের ক্লাসে অংশ নেয়ার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে কিছুই হচ্ছে না।

জনবল সংকটেও ভার্চুয়াল ক্লাসরুমের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়টির কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ভার্চুয়াল ক্লাসরুম থেকে শুরু করে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের টেকনিক্যাল কাজের জন্য জনবল প্রয়োজন। এখানে ভার্চুয়াল ক্লাসরুম পরিচালনার জন্য আলাদা কোনো পরিচালক নেই। কম্পিউটার সেন্টারের লোকবল দিয়েই পরিচালনা করতে হয় এটি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন উর রশিদ আসকারী বলেন, আমাদের যে ভার্চুয়াল ক্লাসরুম রয়েছে, তার বহুমাত্রিক ব্যবহার এখনো সবটুকু করে উঠতে পারিনি। তবে খুব শিগগির এর পরিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভার্চুয়াল ক্লাসরুমটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে প্রশাসনিক ভবনে উপাচার্য দপ্তরের পাশেই। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে হাতে গোনা কয়েকটি ভিডিও কনফারেন্সভিত্তিক ক্লাস হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে নব্বইয়েরও অধিক বিভাগ ও ইনস্টিটিউট থাকলেও অধিকাংশ সময়ই তালাবদ্ধ থাকে ভার্চুয়াল ক্লাসরুমটি। ক্লাস না হলেও বিভিন্ন সময় সভা ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ঠিকই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম আদান-প্রদানের জন্য দুটি পক্ষের প্রয়োজন হয়। হয়তো অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোলাবরেশনের আহ্বান কম থাকায় ভার্চুয়াল ক্লাসরুমের ব্যবহার কম হচ্ছে। তবে এর ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। বিভাগ ও ইনস্টিটিউটগুলোকে এ অবকাঠামো বিষয়ে সচেতন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে আমাদের শিক্ষার্থীদের সংযুক্ত করার চেষ্টা করা হবে।

ক্লাস শুরু না হলেও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে শেকৃবির ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে। যান্ত্রিক সমস্যা সমাধানে ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর বিডিরেনকে চিঠি দিয়েও কোনো সাড়া পায়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গত এপ্রিলে তাদের পুনরায় চিঠি দেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান প্রধান সমস্যাগুলোর সমাধান হয়। কিন্তু প্রযুক্তিগত কিছু কাজ এখনো অসম্পন্ন থাকায় ক্লাসরুমটি পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, একটি নতুন পদ্ধতি চালু হলে এর সঙ্গে পরিচিত হতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়। ভার্চুয়াল ক্লাসরুমের বিষয়টিও একই ধরনের। পর‌্যায়ক্রমে এর ব্যবহার শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। সামনের দিনে এর উপযোগিতা নিশ্চিতের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দেশনা দেয়া হবে।

বিদিবিএস 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।