বহিরাগত নিষেধাজ্ঞার পক্ষে-বিপক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-07-11 07:46:55 BdST | Updated: 2018-12-12 19:21:07 BdST

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের অবস্থান ও ঘোরাফেরা নিষিদ্ধসহ বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক ও শিক্ষাবিদরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে অনেকে বলেছেন, মুক্তচিন্তার প্রাণকেন্দ্রকে সংকুচিত করার সংকেতটি শুভ নয়। এতে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলা হচ্ছে, এর ফলে ক্যাম্পাসে আরও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীসহ যে কেউ অনায়াসেই হেনস্তার শিকার হতে পারেন। তবে জারি করা কিছু পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন কেউ কেউ।

প্রসঙ্গত, ৫ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্তের পর এক বিবৃতিতে বলা হয়- কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাদের ছাত্রত্ব নেই তারা হলে অবস্থান করতে পারবেন না। এ বিষয়ে প্রয়োজনে হল কর্তৃপক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেবেন। হল প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কোনও ছাত্রের অভিভাবক কিংবা অতিথি হলে অবস্থান করতে পারবেন না। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সদস্য ও চরমপন্থীরা যাতে হলে প্রবেশ অথবা অবস্থান করতে না পারে,সে ব্যাপারে হল প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও তৎপর থাকতে হবে। এছাড়া উস্কানিমূলক বক্তব্য ও গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এ ঘোষণার পর বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় সাংবাদিকদের। 

ঢাবির বাণিজ্য অনুষদের সাবেক শিক্ষার্থী ও ব্যংক কর্মকর্তা খাইরুল কবির মানিক এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, এটা মুক্ত চিন্তার একটি রাজ্য। এই রাজ্যে প্রবেশ করার অধিকার সবার রয়েছে। এজন্য এত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অনুমতি নেওয়া লাগবে কেন? এই অনুমতি নিতে যাওয়া মানেই হেনস্তা হওয়া। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ধরনের বার্তা দিয়ে বা এমন কড়া অবস্থান নিয়ে কিসের সংকেত দিচ্ছেন? তারা কি বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও অশান্ত পরিবেশের মধ্যে ফেলতে চাইছেন?’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। আমরাও তো তাহলে বহিরাগত এবং আমাদের যদি ক্যাম্পাসে যেতে হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। এর মানে আমরা সেখানে নিষিদ্ধ।’

অন্যান্য কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী আরও জানান-যারা সাবেক শিক্ষার্থী, তারা প্রায় দিনই অফিস শেষ করে ক্যাম্পাসের দিকে যান। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়। এখন কি তাহলে সেখানে যাওয়া বাদ দিতে হবে? বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এমন আচরণকে বাড়াবাড়ি বলেও অভিহিত করেছেন তারা।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক শিক্ষার্থীদের কয়েকজন বলেছেন, ‘দু-একটি সিদ্ধান্ত ছাড়া বাকিগুলোকে সাধুবাদ জানাই। যেমন- ক্যাম্পাসের আবাসিক হলে অছাত্র কেউ থাকতে পারবে না। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সদস্য ও চরমপন্থীরা যাতে হলে প্রবেশ অথবা অবস্থান করতে না পারে,সে ব্যাপারে হল প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক ও তৎপর থাকবে। এই বিষয়গুলো ইতিবাচক কিন্তু মূল সমস্যা হলো এগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে অনেকেই হেনস্তার শিকার হতে পারেন।’

শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। ক্যাম্পাসকে কড়া নজরদারির ওপরে রাখা এবং ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করাকে অনভিপ্রেত,অযৌক্তিক এবং অবাস্তবায়নযোগ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রশাসনিক চিন্তাভাবনা বাস্তবধর্মী না থাকার কারণে এ ধরনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে রাস্তা চলে গেছে। যে রাস্তা দিয়ে সবসময় রিকশাসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল করে। প্রতিনিয়ম মানুষ চলাচল করে। বহিরাগত মানুষ এমনিতেই চলে আসে। তাহলে বহিরাগত শনাক্ত করবে কী করে?

নিষেধাজ্ঞার ওপর জোর না দিয়ে ক্যাম্পাসকে মুক্তচিন্তার কেন্দ্র হিসেবে সমৃদ্ধ করা উচিত ছিল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এমন নজরদারি করে কিসের সংকেত দিতে চাইছেন? এসব না করে যাতে শিক্ষার সুষ্ঠ পরিবেশ তৈরি হয়,শিক্ষকরা যাতে মনোযোগ দিয়ে শ্রেণিতে পড়ান,শিক্ষকরা যাতে রাজনীতি কম করে অথবা না করে শিক্ষা ও গবেষণায় মনোযোগী হন, তিন দশক ধরে আটকে থাকা ডাকসু নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত হয় সেদিকে খেয়াল না করে ক্যাম্পাসকে আরও অশান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বহুদিন ধরে সিনেট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে সরকার নিজেই ৭৩ এর অধ্যাদেশ লঙ্ঘন করেছে। কারণ ৭৩ অধ্যাদেশ বঙ্গবন্ধুর দেওয়া। সেই অধ্যাদেশ অমান্য করে নিজেদের ইচ্ছামতো একের পর এক উপাচার্য নিয়োগ দিচ্ছে সরকার। তাহলে ক্যাম্পাস তো অশান্ত হবেই। ফলে আমি মনে করি- ক্যাম্পাসটি এখন খণ্ডিত ক্যাম্পাস। এটি এখন আর পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস নয়।’

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট মেম্বার, সাবেক হল প্রভোস্ট এবং পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাজমা শাহীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাস্টার্সের ফল প্রকাশের পরও বহুদিন ধরে শিক্ষার্থীরা হলে থাকতে চান, আমরা তাদের নামানোর চেষ্টা করি, শক্ত অবস্থান নেই। এছাড়াও অনেক সময় অনেক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যা নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু শক্ত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টাও হয়েছে। সেসময় এভাবে পত্রপত্রিকায় ছাপানো হয়নি। এমনকি কর্তৃপক্ষ এভাবে প্রেস বিবৃতি আকারে প্রকাশ করেনি।’ এখনও বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে একটু শক্ত অবস্থানে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে উপাচার্য ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় বাজারঘাটের জায়গা নয়। এটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জায়গা। এখানে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপাদানের সম্মিলন ঘটে। কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবারের সদস্যদের সাধারণ জীবন বিঘ্নিত হয় এমন বহিরাগতদের অবস্থান এখানে কাম্য নয়।’ এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে মঙ্গলবার (১০ জুলাই) দুপুরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে উপাচার্য বলেছেন, ‘কোটা আন্দোলন একটি স্বতর্স্ফূত আন্দোলন ছিল। হাজার হাজার শিক্ষার্থী এতে অংশ নেওয়ার পর আমরা নৈতিক সমর্থনও দিয়েছি। কিন্তু হঠাৎ এই আন্দোলনে অশুভ শক্তি ঢুকে পড়েছে। ফলে তাদের গোপন জায়গা থেকে ভিডিও বার্তার মধ্য দিয়ে আন্দোলন করতে হলো। স্বতর্স্ফূত আন্দোলনকে দুষ্টচক্র নষ্ট করে ফেললো। এই সবই আমাদের নজরে এসেছে। স্পষ্টভাবেই আমরা বুঝেছি, এই আন্দোলনটি পরবর্তীতে দুষ্টচক্রের কারখানায় পরিণত হয়েছে। ফলে আমাদেরও একটি অবস্থান নিতে হয়েছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হক বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অন্যসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রাচীরের মধ্যে অবস্থিত প্রতিষ্ঠান নয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য দিয়ে জনসাধারণের যাতায়াত করতে হয়, এছাড়া বেশ কিছু জাতীয় স্থাপনা রয়েছে যেগুলোর সঙ্গে সাধারণ মানুষ খুব বেশি কানেক্টেড। যেমন- শহীদ মিনার, রাজু ভাস্কর্য, দোয়েল চত্বর। এসব জায়গায় তো সাধারণ মানুষকে আসাতে বাধা দেওয়ার অধিকার আমার নাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আসলে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের টার্গেট করেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ বহিরাগত কারা এটার সঠিক সংজ্ঞায়ন বিবৃতিতে নাই। আবার উস্কানিমূলক বক্তব্য, গুজব রটানো থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কিন্তু এটা কারা করছে? কোটা সংস্কার আন্দোলকারীরা যদি তাদের দাবি নিয়ে কোনও বক্তব্য দেয়, তাহলে সেটাকেই উস্কানিমূলক বক্তব্য বলে চালিয়ে দিয়ে তাদের হেনস্তা করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মূল উদ্দেশ্য এটাই, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্রতিহত করা।’

বিদিবিএস 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।