সেদিন যা ঘটেছিল ঢাবির দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে


টাইমস ডেস্ক
Published: 2018-07-17 09:01:03 BdST | Updated: 2018-10-22 19:20:49 BdST

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের দুই শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান আসাদ ও রোকেয়া গাজী লিনার ওপর গত শনিবার (১৪ জুলাই) বিকালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু উচ্ছৃঙ্খল শিক্ষার্থীর হামলার ঘটনাটির বর্ণনা দিয়েছেন লিনা। ওই ঘটনায় আসাদসহ তিনি মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পর সেদিন মধ্যরাতে তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, ‘‘আমি আর আমার বন্ধু আসাদ রিকশার জন্য সূর্যসেন হলমুখী সড়ক থেকে রেজিস্ট্রার বিল্ডিং গেটের দিকে যাচ্ছি। ঠিক তখন সামনে থেকে এসে ১০-১২ জন ছেলে আমাদের পথ আটকায়। হতভম্ব হয়ে গেলেও আমরা দাঁড়ালাম। প্রথমে একটা ছেলে ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে এসে জানতে চাইলো আমরা এই ক্যাম্পাসের কিনা? বললাম হ্যাঁ! আমরা দুজনেই ক্যাম্পাসের। আসাদকে তখন সে জিজ্ঞেস করলো, ‘কোন ইয়ার? তুই কোন হলে থাকিস?’ আমি বললাম, আমরা অর্থনীতি তয় বর্ষের। ইভেন আমি আমার হল আইডি কার্ড দেখিয়ে বললাম, ‘ভদ্রভাবে কথা বলো।’ কিন্তু, কোনও তোয়াক্কা না করেই আবারও আসাদকে সে বললো, ‘তুই কোন হল-এর? আইডি কার্ড দেখা!’’’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘‘আসাদ পোলাইটলি (শান্তভাবে) জানতে চাইলো, তোমরা কোন ইয়ার? কোন হল? কেন চার্জ করছো এভাবে?’ তারা নিরুত্তর এবং মারমুখী ছিল তখন। আসাদ আইডি কার্ডটা দেখানোর পর আইডি কার্ডটা দিয়েই ছেলেটা বলল, ‘প্রথম বর্ষের ছেলে কি তোরে চার্জ করতে পারে না? ১ম বর্ষের পোলাপানের হাতে মাইর খাইতে খুব মজা লাগবো?’ বলেই ঠাস করে আসাদকে থাপ্পড় মারে। আমি তখন জানতে চাই ‘কি করলে এটা?’ তখন বাকিরাও চড়াও হয় এবং আমাকেসহ হ্যারেস (লাঞ্ছিত) করে। এরপর আসাদকে এলোপাতাড়িভাবে মারতে থাকে। আমি তখন আমার এক পরিচিত বন্ধুকে বলি আসতে। বলি, আমাদের অপরিচিত কয়েকটা ছেলে বাজেভাবে আক্রমণ করছে। ’’

‘‘প্রশ্ন থাকতে পারে প্রক্টোরিয়াল টিমকে কেন কল দিলাম না। প্রথমত আমার কাছে নম্বর ছিল না। আর তারা তখনই খুব জোরে হেঁটে সূর্যসেন হল এর গেটের ভেতরে চলে যায়। আর আমরা ঘটনার আকস্মিকতায় মেন্টালি শকড ছিলাম। আসাদ তাদের পেছন পেছন হল গেটের ভেতরে গিয়ে যখন জানতে চাইলো, ‘আমি এই ক্যাম্পাসের পরিচয় দেওয়ার পর, আইডি কার্ড দেখানোর পরও আমাদের গায়ে কেন হাত তুললে তোমরা?’ তখন তারা মোটেই অনুতপ্ত না হয়ে বলছে ‘ তুই হল এর ভেতরে আসলি কেন আবার?

‘‘আসাদকে তারা আবার মারতে আসে। তখন ওরা ১৫-২০ জন। অনেক মানুষই ছিল। মজা নিচ্ছিল নাকি ঘটনার আকস্মিকতায় তারাও চুপ জানি না! আমি তখন আসাদকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার সময় ওরা গেস্টরুম থেকে স্ট্যাম্প, কাঠ নিয়ে আসে মারতে। আসাদ এর মাথায়, মুখে, কাঁধে, পায়ে-সমস্ত শরীরে বাজেভাবে আঘাত করা হয়েছে ।
‘‘আমি বাধা দিতে যাওয়ায় আমার গায়েও লাঠির আঘাত, তাদের জোরাজুরি আসাদকে আলাদাভাবে নিয়ে মারার জন্য। আমার পায়ে জুতা দিয়ে পিষে দেওয়ায় আমার নখ উঠে গেছে। ব্লিডিং হচ্ছিল। তখনও তারা থামে নাই। এফবিএস (ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস স্ট্যাডিজ), সূর্যসেন হল, ক্যাফেটেরিয়া এই তিন রাস্তার মোড়ে এসে আসাদের হলের কিছু পরিচিত মানুষজন আসতে দেখায় তারা চলে যায়। কিন্তু ফিরে আবার মারমুখী হয়ে হুমকি দেয়।
‘‘আমরা দুজনেই মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত। নিজের ক্যাম্পাসে এরকম শারীরিক, মানসিক, হ্যারেসমেন্ট (লাঞ্ছনা), হামলার শিকার হবো সেটা মেনে নেওয়া অসম্ভব। আজকে পরিচয়পত্র দেখানোর পর তাদের সিনিয়র জানার পরও ওরা হ্যারেস করল। আমার যে জুনিয়র বোন বা ভাই মাত্রই ক্যাম্পাসে আসলো তাদের নিরাপত্তা কি তাহলে? আমার ক্যাম্পাসে আমি অতর্কিত হামলার শিকার হবো কেন?

‘‘আমরা সূর্যসেন হল এর প্রভোস্ট স্যার এর সঙ্গে কথা বলেছি। স্যার আমাদেরকে আগামীকাল (রবিবার) লিখিত অভিযোগ দিতে বলেছেন। প্রক্টোরিয়াল টিমও আমাদের ন্যায্যবিচার এর আশ্বাস দিয়েছেন এই পর্যন্ত। আমরা লিখিত দেবো।

‘আসাদ এর শারীরিক অবস্থা তেমন ভালো না। আমার পায়ে ড্রেসিং করতে হয়েছে। মাথা আর ঘাড় এ প্রচণ্ড ব্যথা।
‘অনেকের অনেক প্রশ্ন মনে জাগছে বা বিষয়টার সঙ্গে অন্য কোনো কিছু যুক্ত কিনা জানতে চাইছে।

(i_am_clearing_on_this_point) আমি এই বিষয়টি পরিষ্কার করে দিচ্ছি। আমাদের যারা চেনেন তারা নির্দ্বিধায় বলতে পারবেন আমাদের এই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কিছুর সংশ্লিষ্টতা নেই। এটা সম্পূর্ণটাই আমাদের অসম্মান করা হয়েছে। আমাদের যথেষ্ট সম্মান এবং পরিষ্কার ইমেজ আছে ক্যাম্পাসের সবার কাছে। তাই এটা কিছু আদর্শচ্যুত ছেলেদের অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রমণ। (we have enough honorable and clean image in our university to senior, junior, classmates. so, it was just unexpected hit from some morally destroyed boys.)
‘নিজ মুখে নিজ ক্যাম্পাসের ভয়াল বিভীষিকাময় ঘটনার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে আজ আমি ঢাবিয়ান বলতেই এক অসামান্য লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছি।

‘আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, আমি আশাকরি আইনগত উপায়ে এর ন্যায়বিচার পাবো। তখনই শুধুমাত্র শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে পারবো। এটা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মসম্মানের প্রশ্ন, এটা কেউ অগ্রাহ্য করতে পারে না।
(I AM IN TRAUMA. BUT I HOPE FOR JUSTICE BY LEGAL APPROACH. ONLY THEN I WILL TAKE BREATHE IN PEACE.IT'S NOW A QUESTION OF DHAKA UNIVERSITY'S SELF RESPECT. NO ONE CAN DENY THAT.)’’
‘#justice #no_harrasement_in_campus #never_again’

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের দুই শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগে সূর্যসেন হলের তিন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। রবিবার (১৫ জুলাই) সন্ধ্যায় এই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়। ভুক্তভোগী ওই দুই শিক্ষার্থীর জবানবন্দি ও অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগ এবং সিসিটিভি ফুটেজের সত্যতার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বহিষ্কৃতরা হচ্ছে উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সিফাত উল্লাহ সিফাত, সূর্যসেন হল শাখা ছাত্রলীগের সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মোল্লা মোহাম্মদ আল ইমরান পলাশ, ইংলিশ ফর স্পিকারস অব আদার ল্যাঙ্গুয়েজেস (ইসোল) বিভাগের মাহমুদ অর্পণ।

বহিষ্কারের বিষয়ে প্রক্টর গোলাম রব্বানী বলেন, অভিযোগকারীদের দেওয়া হামলাকারীদের নামের বিষয়ে হল প্রশাসনের গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি অনুসন্ধান চালায় এবং ঘটনার সত্যতার বিষয়ে নিশ্চিত হয়। তারই ভিত্তিতে সাময়িকভাবে তিনজনকে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এসএম/ ১৭ জুলাই ২০১৮

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।