ভিকারুননিসায় বিপুলসংখ্যক ছাত্রী টেস্ট পরীক্ষায় ফেল!


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-12-13 22:56:04 BdST | Updated: 2019-09-22 10:45:18 BdST

অতিরিক্ত অর্থ আদায়ে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি পরীক্ষায় ফরমপূরণে ছাত্রীদের কাছ থেকে জনপ্রতি অতিরিক্ত ৪ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। এভাবে নির্ধারিত অর্থের চাইতে প্রায় ৮০ লাখ টাকা অতিরিক্ত আদায় করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে ছাত্রী ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলাপ করে এসব অভিযোগ ও তথ্য পাওয়া গেছে।

এবার প্রতিষ্ঠানটির বিপুলসংখ্যক ছাত্রী টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করেছে। তবে কত সংখ্যক ছাত্রী ফেল করেছে তার সঠিক হিসাব জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। তবে প্রায় ৩০ শতাংশ ছাত্রী ফেল করেছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বৃহস্পতিবার স্কুলটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ২০১৯ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে চাওয়া পরীক্ষার্থীরা নিজ নিজ শ্রেণি শিক্ষকদের কাছে অতিরিক্ত ৪ হাজার টাকা জমা দিয়ে পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য ব্যাংকের রশিদ সংগ্রহ করছে। ৪ হাজার টাকা না পরিশোধ করলে কাউকে ফরম পূরণ বাবদ পরীক্ষা ফি দেয়ার জন্য ব্যাংকের রশিদ দেয়া হচ্ছে না।

শিক্ষার্থী ও অবিভাবকদের অভিযোগ, ফরম পূরণের জন্য ব্যাংকের রশিদ দেয়া হলেও অতিরিক্ত ৪ হাজার টাকার কোনো রশিদ দিচ্ছে না কলেজ কর্তৃপক্ষ।

এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘মডেল টেস্ট ও পিকনিকের জন্য টাকা নেয়া হচ্ছে। এই ৪ হাজার টাকা না দিলে ফরম পূরণের জন্য ব্যাংকের রশিদ দেয়া হচ্ছে না। আমি যদি চাই আমি কোনো মডেল টেস্ট দেব না, পিকনিকেও যাব না, তারপরও এই টাকা দেওয়াই লাগবে। আমাদেরকে আগেই বলা হয়েছে, এটা বাধ্যতামূলক।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, ‘তারা তো টাকাখোর। কিছু দিন পরপর হিসাব ছাড়াই অতিরিক্ত টাকা আদায় করে। না দিলে হুমকি দেয় পরীক্ষায় অংশ দিতে দেয়া হবে না। এই স্কুলে পড়তে হলে টাকার ব্যাগ নিয়ে বসতে হবে।’

তবে ভিন্ন চিত্রও লক্ষ্য করা গেছে। কয়েকজন অভিভাবককে দেখা গেছে, তাদের সন্তান একটি বিষয়ে ফেল করলেও তারা তাকে (সন্তান) পরীক্ষা দিতে অনুমতি দেয়ার জন্য শিক্ষকদের কাছে অনুরোধ করছেন। এ বিষয়ে অভিভাবকরা এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ফেল করা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে দেয়া হবে কিন্তু শিক্ষকরা এর জন্য আলাদা অর্থ চাচ্ছেন। টাকা দিলেই তারা পরীক্ষা দেয়ার জন্য অনুমতি দেবেন।’

কয়েকজন অভিভাবকের ভাষ্য, এমনিতেই নির্বাচনী পরীক্ষার প্রশ্ন অনেক কঠিন করা হয়। তাই একটি বিষয়ে ফেল হতেই পারে। বোর্ড পরীক্ষায় তারা ঠিকই ভালো করবে। কিন্তু তারা ফেল করেছে বলে তাদেরকে পরীক্ষা দিতে দেয়া হবে না, আবার পরীক্ষা দিতে চাইলে আলাদা টাকাও দিতে হবে-এটা অন্যায়। তারা এ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছে। কয়েকদিন আগে এতকিছু ঘটে গেল, তারপরও তাদের শিক্ষা হয়নি।



বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত পরীক্ষার ফরম পূরণ ছাড়া বাড়তি ৪ হাজার টাকা পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে কেন নেয়া হচ্ছে-জানতে চাইলে কলেজের নতুন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হাসনা হেনা অস্বস্তিবোধ করেন। তিনি কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। এ সময় তাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখা যায়। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আসলে আমাদের প্রতিষ্ঠানের অনেক নাম আছে। দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে আমরা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছি। আপনারা সাংবাদিকরাও চাইবেন এর সুনাম যেন নষ্ট না হয়।’

প্রশ্নের উত্তর সরাসরি না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ায় অধ্যক্ষকে একই প্রশ্ন আবার করা হলে তখন তিনি বলেন, ‘আসলে এবার যারা পরীক্ষা দেবে তাদেরকে তো ফাইনাল পরীক্ষার আগ পর্যন্ত মডেল টেস্ট দিতে হবে। তাছাড়া তাদের র‌্যাগ ডে আছে। তাদের পিকনিক আছে। এগুলো তো আমরাই আয়োজন করি। এ কারণেই টাকাটা নেয়া হচ্ছে।’

কিন্তু শিক্ষার্থীরা কি এই টাকা দিতে বাধ্য?-প্রশ্ন করলে অধ্যক্ষ হাসিনা বেগম বলেন, ‘না, তারা বাধ্য নয়। যারা চাইবে পিকনিকে যাবে না, মডেল টেস্ট দেবে না, তাদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হচ্ছে না। গর্ভনিং বডিতে এই বাড়তি ৪ হাজার টাকা নেয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তো আসলে কয়েকদিন হলো যোগদান করেছি। এ বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে যেহেতু নেয়া হচ্ছে অবশ্যই এ বিষয়ে অনুমতি আছে।’ তবে তিনি এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের কোনো কপি দেখাতে পারেননি।

এ ব্যাপারে ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার বলেন, ‘ফরম পূরণে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ব্যাপারে খোদ হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা আছে। যারা এ কাজটি করবেন তারা আইন অমান্য ও আদালত অবমাননা করবেন। এ ব্যাপারে তাদের শাস্তি পেতে হবে।’

প্রতিষ্ঠানটি থেকে এবার প্রায় ২ হাজার ছাত্রী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে ১ হাজার ৪৯২ জন এবং মানবিক ও বিজনেস স্টাডিজে যথাক্রমে ২০০ ও ৩০০ জন। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগেই তিনের অধিক বিষয়ে ফেল করেছে ১১৯ জন। এক ও দুই বিষয়ে ফেল করেছে আরও শতাধিক। মানবিক ও বিজনেস স্টাডিজ গ্রুপে ফেল করা ছাত্রীর তথ্য জানা যায়নি। তবে সবমিলে ৩০ শতাংশ ফেল করেছে বলে জানা গেছে।

ফেল করা শিক্ষার্থীদের তথ্য জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। তবে যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি তাদেরকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেয়া হবে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করব সবাই যেন পরীক্ষা দিতে পারে। যারা ফেল করেছে তাদেরকে পরীক্ষার আগে আরও ভালো করে পড়ানো হবে। তারা আবার পরীক্ষা দেবে। তারপর তাদেরকে পরীক্ষায় বসতে দেয়া হবে।’

কিন্তু ফেল করা শিক্ষার্থীদেরকে পরীক্ষায় বসতে দেয়ার কোনো নিয়ম নেই জানালে তিনি বলেন, ‘আমরা তো চাই কেউ পরীক্ষার বাইরে না থাকুক। আমরা আশা করব তারা পরীক্ষা দিয়ে পাস করুক।’

ফেল করা পরীক্ষার্থীদের কাছে বাড়তি অর্থ নিয়ে তাদেরকে নাকি পরীক্ষায় বসতে দেয়া হবে-এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ অসত্য তথ্য।’

তবে এবার নির্বাচনী পরীক্ষায় কতজন পরীক্ষার্থী পাস করেছে-এর হিসাব জানতে চাইলে তিনি তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।