সাহিত্যের টানে ঢাবি শিক্ষার্থীদের বুক টিউব


ঢাবি টাইমস
Published: 2019-01-16 11:38:58 BdST | Updated: 2019-11-15 00:12:44 BdST

শিক্ষার্থীদের সাহিত্যপাঠে আগ্রহী করতে ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বইপ্রেমীদের সংগঠন—‘বইয়ের ফেরিওয়ালা’। ‘বুক টিউব’ নামের ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন ভিডিও কনটেন্ট পাঠকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে সংগঠনটি।

১১ জানুয়ারি সকাল ৯টা। হালকা শীত। সিনেট ভবনের সামনে দেখা মিলল ‘বইয়ের ফেরিওয়ালা’ টিমের সঙ্গে। আগেই ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ ফেসবুক গ্রুপে এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সজল কুমার দাস লিখেছিলেন, বুক টিউবের (www.youtube.com/channel/UChFMHbRJVWDzW-d8DLjiCew) জন্য কয়েকজন বইপড়ুয়া ছেলে-মেয়ে দরকার। জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল পরবর্তী শুটিংয়ের স্থান ও সময়। সেই সূত্রেই এখানে আসা। ততক্ষণে ক্যামেরা চালু হয়ে গেছে। শাড়ি পরা এক তরুণী কথা বলছেন তসলিমা নাসরিনের ‘উতল হাওয়া’ বইটি নিয়ে। এই ফাঁকে কথা হলো সজলের সঙ্গে।

জানালেন, ‘বুক টিউবের কার্যক্রম শুরু হয়েছে গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে। ইন্টারনেটে বিদেশি একটি ভিডিও ক্লিপ দেখে এই ইউটিউব চ্যানেলটির আইডিয়া পেয়েছি। ভাবলাম, আমাদের এখানেও কাজটি শুরু করা যায়। বইয়ের ফেরিওয়ালার সদস্যদের নিয়ে কাজে নামলাম। বুক টিউবের সক্রিয় সদস্য সংখ্যা বিশের কাছাকাছি। সবার কথা মাথায় রেখে বন্ধের দিনে শুটিং করি। বেশির ভাগ সময় ক্যাম্পাসের ভেতরেই শুটিং চলে। কখনো কখনো বাইরেও যাই। গত মাসে কাঁটাবনের দীপনপুর বইয়ের দোকানে শুট করেছি। এর আগে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসেও শুট করেছি একদিন।’

বুক টিউবিংয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন প্রজ্ঞা চন্দ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। এর আগে প্রায় ১৫টি বুক রিভিউতে অংশ নিয়েছেন। এদিন ইস্কিলাসের ‘শৃঙ্খলিত প্রমিথিউস’ ও এইচ. জি. ওয়েলসের ‘অদৃশ্য মানব’ বই দুটির পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকেরও রিভিউ করবেন তিনি। এর মধ্যেই বুক টিউবিংয়ের শুট শেষ করলেন সুপ্তি দাস চৈতি। ক্যামেরার সামনে ‘উতল হাওয়া’র পাশাপাশি বুদ্ধদেব বসুর ‘পুনর্মিলন’ বইটিরও রিভিউ করে এলেন। সুপ্তি জানালেন, ‘সাহিত্যের পাঠক সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা একাডেমিক লাইফের বাইরে ভার্চুয়াল জগত্ নিয়েই যেন ব্যস্ত। যিনি বই পড়েন না, তিনি কি আর বইয়ের রিভিউ পড়বেন? এই চিন্তা থেকে আমরা ভিডিও রিভিউর কথা ভাবলাম। সহজ ও আকর্ষণীয় উপায়ে বই উপস্থাপনের চেষ্টা করি আমরা, যেন ফেসবুক বা ইউটিউব ঘাটতে ঘাটতে কারো সামনে কোনো রিভিউর ভিডিও ক্লিপ চলে এলে তিনি বইয়ের প্রতি আগ্রহ বোধ করেন।’

বুক টিউবের শুরু থেকেই ক্যামেরার পেছনে শ্রম দিচ্ছেন লিপটন মণ্ডল। পড়েন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের চতুর্থ বর্ষে। জগন্নাথ হলে সজলের পাশের রুমে থাকেন। সজল তাঁর সঙ্গেই প্রথম বুক টিউবের আইডিয়াটি শেয়ার করেছিলেন। লিপটন শৌখিন ফটোগ্রাফার। নিজের ক্যামেরা আছে। তাই ভাবলেন, শখকে সৃজনশীল কাজে লাগাতে পারলে মন্দ হয় না। তিনি জানালেন, ‘প্রথম দিকে শব্দগ্রহণের জন্য মাইক্রোফোন বা ক্যামেরার স্ট্যান্ড ছিল না। এ কারণে ভালো মানের কনটেন্ট তৈরি করতে সমস্যা হচ্ছিল। ধীরে ধীরে নিজেরা টাকা জমিয়ে স্ট্যান্ড ও মাইক্রোফোন কিনেছি।’ ক্যামেরার পেছনের কাজটুকু তিনি বেশ উপভোগ করেন। তিনি আর আফ্রিদি মিলে ধারণ করেন ভিডিও। এডিট করেন সজল।

এদিন প্রথমবারের মতো বুক টিউবিংয়ে অংশ নিতে এসেছিলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবদুল্লাহ সাদমান জামী। হুমায়ূন আহমেদের ‘কবি’ উপন্যাসের রিভিউতে তিনি অংশ নিয়েছেন। জামী বললেন, ‘কবি উপন্যাসে বেশ কয়েকটি কবিতা আছে। কবিতাগুলো হুমায়ূন আহমেদেরই লেখা। উপন্যাস বা গল্প দিয়ে নাম কুড়ালেও কবি হিসেবে হুমায়ূন কতটা শক্তিশালী ছিলেন—এই বইটি পড়লে তা জানা যাবে।’

বুক টিউবে বুক রিভিউ, লেখক পরিচিতি, কবিতা আবৃত্তির পাশাপাশি গল্প ও উপন্যাস পাঠের অডিও ক্লিপও প্রকাশ করা হয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের কথা মাথায় রেখে এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও অবসর বা জ্যামের ফাঁকে কাছে বই না থাকলে যে কেউ এই চ্যানেলের মাধ্যমে সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে পারবেন। এখানে বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী প্রিয়াংকা বিশ্বাস ছোটগল্প পাঠের অডিওতে কণ্ঠ দেন। মোবাইলে রেকর্ড করে সেই ক্লিপ তিনি পৌঁছে দেন ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র সজলের কাছে। সজলের মাধ্যমে সেগুলো বুক টিউবের চ্যানেলে উঠে আসে। ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে কথা হলো প্রিয়াংকা বিশ্বাসের সঙ্গে। জানালেন, ‘ডিপার্টমেন্টের ভাই-বোনগুলো সুন্দর একটি উদ্যোগ নিয়েছে। সরাসরি কাজ না করলেও নেপথ্যে কণ্ঠ দিয়ে পাশে থাকতে পেরে আমার ভালো লাগছে।’