অভ্র কী বোর্ডের পিছনের গল্প!


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-01-02 22:16:11 BdST | Updated: 2018-01-17 12:41:07 BdST

অভ্র। আভিধানিক অর্থ ‘আকাশ’। অভিধান ঘেটেঁ এই নামটি বের করেছিলো একজন ১৮ বছরের তরুণ, তার স্বপ্নের নাম দিতে। এটি হবে বিনামূল্যের সফটওয়্যার,যেখানে সবাই স্বাধীনভাবে ব্যবহার করবে, এসব চিন্তা করে এই নামটাই তার সবচাইতে মনে ধরেছিলো।

হালকা পাতলা ধরনের একটি ছেলে। চোখে চারকোনা মোটা ফ্রেমের চশমা, আর মাথা ভর্তি চুল। যা দিয়ে নিমিষেই আলদা করা যায় তাকে। কোন একটি জায়গায় চুপ করে দাঁড়াচ্ছে না, হেঁটে যাচ্ছে, হেঁটেই যাচ্ছে; কথা বললে হাত পেছনে নিয়ে শুনছে, তাকাচ্ছে এদিক ওদিক। এই তাকানোটাতে আবার কোন লুকোছাপা নেই। পূর্ণ দৃষ্টি। ক্যাম্পাসে ভয়ডরহীন আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হাসি।

সহজ ভাষায় এই হচ্ছে মেহদী। মেহদী হাসান খান। অভ্রের জনক।

অভ্র শুরুর গল্পঃ

অভ্রের প্রথম ভার্সনে এর কিবোর্ড লে আউটের নাম ছিলো ’ইউনিবিজয়’। এর কারন হলো, ইউনিকোড ভিত্তিক ’ইউনিবাংলা’ ফন্ট এবং বিজয় কি বোর্ডের ইউনিকোড সংস্করণ ছিলো অভ্রের প্রাথমিক ধারনাতে। যদিও ঠিক পরের সংস্করণেই মেহদী সেটার নাম বদলে রাখেন ’অভ্র’।

অভ্রের শুরু ২০০৩ সালে। মেহদী হাসান খান তখন নটরডেম কলেজের ছাত্র। ক্লাস নাইন থেকেই তার প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি নেশা। নিজে নিজেই বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রোগ্রামিংয়ের উপর বই পত্র জোগাড় করে নিজেই একাডেমিক পড়াশোনার ফাকেঁ ফাকেঁ প্রোগ্রামিং নিয়ে পড়াশোনা ও চর্চা চালিয়ে যেতেন সে সময়। ২০০৩ সালের একুশে বইমেলায় বায়োস (Bangla Innovation Through Open Source) নামের একটা বাংলাদেশী সংগঠন থেকে কিছু ছেলেমেয়ে পুরোপুরি বাংলায় লোকালাইজ করা একটা লিনাক্স ডিস্ট্রো নিয়ে এসেছিলো। নাম ‘বাংলা লিনাক্স’। মানে সেখানে শুধু বাংলাতে লেখাই যায় না, সেই সাথে সব উইন্ডোর টাইটেল, মেনু, ফাইলের নামকরণ সব ছিলো বাংলায়।

কম্পিউটারে তখন বাংলা বলতে ’বিজয়’ আর ‘প্রবর্তন’। খুব দরকার পড়লে সেগুলো দিয়ে শুধূ বাংলায় টাইপ করা যায়। কিন্তু পুরো অপারেটিং সিস্টেম বাংলায়, এর আগে এমনটা আর কখনো দেখা যায়নি। এমনকি ’বায়োস’ বইমেলা উপলক্ষ্যে নিজেদের যে সাইট বানিয়েছিলো, সেটাও বাংলায়! এইসব দেখে কিশোর মেহদী মুগ্ধতায় অভিভূত ও বিস্মিত হয়ে যায়।

বায়োস একটা নতুন ফন্টও বানিয়েছিলো সেই ডিস্ট্রোর জন্য। নাম ’ইউনিবাংলা’। সেখান থেকেই ইউনিকোড নিয়ে মেহদীর জানা শোনার সূত্রপাত। মেহেদী তখন উইন্ডোজ ব্যবহার করতো, তাই সঙ্গত কারনেই সেই বাংলা লিনাক্স তার কোন কাজে আসলো না। কিন্তু সে ঐ ফন্টটি নিয়ে পড়ে থাকলো। ফন্টটি ইন্সটল করার পর সে খেয়াল করলো, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড এ ইনসার্ট কি ব্যবহার করে খুব সহজেই যুক্তাক্ষর বানানো যাচ্ছে। মানে, তখন যেমন বাংলা যুক্তাক্ষর বানানোর জন্য বিশেষায়িত সফটওয়্যার আর ফন্ট উভয়ই লাগতো, তেমনটা আর লাগছে না, তার বদলে শুধুমাত্র ফন্ট দিয়েই যুক্তাক্ষর বানানো যাচ্ছে।

কিন্তু ইনসার্ট ক্যারেক্টার ব্যবহার করে একটা একটা করে অক্ষর টাইপ করা অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ ও বিরক্তিকর কাজ, তাই মেহদীর মনে হলো, এখন জাষ্ট একটা কি বোর্ড ইনপুট মেথড হলে এই ফন্ট দিয়েই দিব্যি বাংলা টাইপিংয়ের কাজ চালিয়ে নেওয়া যাবে।

সে ভাবলো এটা হয়তো কেউ না কেউ ইতিমধ্যেই বানিয়ে রেখেছে। তাই সেটা খোজাঁর আশায় সে পুরো ইন্টারনেট চষে বেড়ালো। কিন্তু মেহদী অবাক হয়ে খেয়াল করলো, উইন্ডোজে কাজ করে এমন কোন ইউনিকোডভিত্তিক কিবোর্ড লে আউট কোথাও নেই। সে বুঝলো, এই জিনিসটা এখন পর্যন্ত কেউ বানায় নি। সুতরাং, তার যদি একান্তই এটার প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটা তাকে নিজের হাতে বানিয়ে প্রয়োজন মেটাতে হবে।

যেই ভাবা সেই কাজ। ততদিনে সে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। মেডিকেলের প্রচন্ড পড়াশোনার চাপ মাথায় নিয়ে সে তার হোষ্টেলের রূমে বসে দরজা বন্ধ করে ঐ ইউনিকোড ভিত্তিক কিবোর্ড বানানোর কাজে লেগে পড়লো। রাত দিন খেটে সে মুটামুটি কাজ চালানোর মতো একটা প্রোটোটাইপ দাঁড় করিয়ে ফেল্ল। এটা করতে গিয়ে তার চোখের নীচে কালি পড়ে গেলো, ক রাত ঘুমায় না কে জানে? যে ছেলে রেগুলার মেডিসিন ক্লাবে আসতো, মেডিসিন ক্লাবের প্রত্যেকটা কাজে সরব, উপস্থিতিও সেরকম প্রানোচ্ছল, হঠাৎ করে সে ছেলেটা হয়ে গেলো চুপচাপ। মাথা নিচু করে হাঁটছে, জিজ্ঞাসা করলে কথা বলছে। মেহদীর চরিত্রের সাথে যায় না।

কিছুদিনের মধ্যে ক্যাম্পাসে জানাজানি হয়ে গেলো, মেহদী কম্পিউটারে বাংলা লেখার জন্য নিজস্ব একটা সফটওয়্যার বানাচ্ছে। তো এরপর দেখা হলে মেডিক্যালের সিনিয়র ভাইরা জিগেস করতো - ’কত করে নিবি?’

মেহদী অবাক হয়ে উত্তর দিতো -’ মানে? কিসের কত করে নিবো?’

- আরে তোর সফটওয়্যারের দাম কত করে রাখবি?

- দাম রাখবো কেন? ওটা তো ফ্রি। কোন টাকা পয়সা দিতে হবে না।

- বলিস কি!

- হ্যাঁ। ভাষার জন্য টাকা নেবো কেন?

মেহদীর কথা শুনে তাদের আক্কেলগুড়ুম হয়ে যেতো। ১৯ বছরের একটা ছেলে বলছে এই কথা!

মেহদী যেহেতু উইন্ডোজ ওএসের জন্য এ্যাপ্লিকেশন বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, সেহেতু তাকে স্বভাবতই মাইক্রোসফটের ডটনেট ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করতে হলো। পরে ভারতের একটা বাংলা ফন্ট প্রতিযোগীতায় ইমেইল করে নিজের বানানো প্রোটোটাইপটা পাঠানোর পর তারা জানালো, ’এইটা তো ঘন ঘন ক্র্যাশ করছে’। তারপর আবার রাতের পর রাত জেগে সেই প্রোটোটাইপের বাগ সারানো। তার আগে ডটনেট বাদ দিয়ে ক্লাসিক ভিজুয়াল বেসিকে সবগুলো কোড নতুন করে আবার লেখলেন মেহদী। (যদিও পরবর্তীতে আবারো একেবারে নতুন করে কোড লেখা হয় Delphi/Object Pascal এ। বর্তমানে অভ্র এই ফ্রেমওয়ার্কেই আছে।) ক্র্যাশের ঝামেলা কমলো। তারপর সে মনোযোগ দিলো অভ্রর অফিসিয়াল সাইটটা বানানোয়। মেহদী তার সাইটে ফোরাম সেটাপ করলো, এটা অভ্রর জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ছিলো। ফোরামে অভ্র’র ইউজাররা ফিডব্যাক দিতো, বাগ রিপোর্ট করতো, প্রশ্নত্তোর চলতো।

মেহেদী ততদিনে অভ্রকে বেশ সিরিয়াসভাবে নেওয়া শুরু করেছেন। কিন্তু কলেজে পড়ুয়া একটা ছেলে শখের বশে ঘরে বসে একটা সফটওয়্যার বানিয়েছে, এই কথা জানলে স্বভাবতই কেউ অভ্রকে পাত্তা দিতে চাইবে না। তাই তিনি যথাসম্ভব চেষ্টা করলেন তার কাজে পেশাদারিত্বের ছোঁয়া রাখার। তিনি নিয়মিত রিলিজ লগ লিখতেন, নিয়মমতো ভার্সন নাম্বার বাড়াতেন, বিশাল বিশাল সব ইউজার ম্যানুয়াল লিখতেন, যাতে করে যে কেউ প্রথম দেখায় ভাবে যে এটা একটা পেশাদার সফটওয়্যার ডেভেলপার টিমের কাজ। কোন একক মানুষের শখের বশে অবসরে বানানো কোন হেলাফেলার জিনিস নয়।

মেহেদীর উদ্দেশ্য সফল হলো পুরোপুরি। তারঁ নিজের মুখ থেকেই শোনা যাক - “আমাকে যারা চিনতো না, তাদের অনেকের ধারনা ছিলো, দেশের বাইরে থেকে প্রফেশনাল সফটওয়্যার ডেভেলপারের একটা গ্রুপ এই প্রজেক্টটা চালায়। এখন ফ্রি দিচ্ছে মার্কেটিংয়ের জন্য। পরে পয়সা নিবে। দেশ নিয়ে আমাদের এই ধরনের অবজ্ঞা কেন, আমি জানি না। যেন দেশে ভালো কিছু হতে পারে না। তাছাড়া, শখের প্রজেক্টেই বা কি সমস্যা?”

মেহদী তার ব্রেইনচাইল্ড অভ্রের পেছনে রীতিমতো পাগলের মতো লেগে রইলেন আর একে আরো নিখুতঁ করার জন্য ক্রমাগত শ্রম দিতে লাগলেন। যখনি মনে হয়, কাজ প্রায় শেষ, তখনি হঠাৎ নতুন নতুন আইডিয়া আসে, আর তিনি সাথে সাথেই নাওয়া খাওয়া ভুলে সেটা নিয়ে কাজে নেমে যান।

এমনও হয়েছে, রাতে ঘুমানোর জন্য বিছানায় যাবার পর বাতি নিভিয়ে শোবার কিছুক্ষন পরেই মনে হয়েছে, কোন একটা ডায়লোগ বক্সের বাটন গুলোর ডিভাইডারের দাগগুলো পেশাদার সফটওয়্যার কোম্পানি যেভাবে দেয়, সে সেভাবে দেয়নি। তখনি বাতি জ্বালিয়ে বিছানা থেকে উঠে আবার কম্পিউটার ছেড়ে সেই ডায়লোগবক্সের বাটনের ডিভাইডার নিয়ে কাজ করেছে। সেটা করার সময় আরো অনেক বাগ ধরা পড়লো, কিংবা নতুন আইডিয়া আসলো, দেখা গেলো কাজ শেষ করে তিনি যখন আবার বিছানায় গেছেন, ততক্ষনে সকাল হয়ে গেছে।

অভ্র নিয়ে রাত দিন পড়ে থাকার কারনে মেহদীর মেডিকেলের পড়া শিকেয় উঠলো। এই দেখে সেখানকার তাবৎ বিজ্ঞ শিক্ষকেরা ঘোষণা দিয়ে জানিয়ে দিলেন, এ ছেলে মেডিকেলের অনুপযোগী। বিজ্ঞ শিক্ষকেরা বলে দিলেন, সময় থাকতে মেডিকেল ছেড়ে দিতে। মেডিকেলের অসহ্য, দমবন্ধ করা পৃথিবী মেহদীকে চেপে ধরছিলো আষ্টেপৃষ্ঠে, মরে যাওয়ার কথা ছিলো ছেলেটার। একদিকে নতুন আইডিয়া, তার স্বপ্ন, আরেকদিকে মেডিকেল। অসম্ভব অস্থিরতা। তবু শত্রুর মুখে ছাই আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে দিন শেষে সে ঠিকঠাকভাবেই মেডিকেলের পাট চুকাতে পেরেছিলো। তিন সাফল্যের সাথেই এমবিবিএস পাশ করে বের হন।

সে সময়ের জনপ্রিয় প্রযুক্তি বিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন “কম্পিউটার টুমোরো” একদিন ফিচার প্রতিবেদন করলো মেহদীর অভ্রকে নিয়ে। শুধু তাই না, সেই ম্যাগাজিনের সাথে অভ্রের সিডির একটা করে কপি ফ্রি দেয়া হয়েছিলো। “সে মাসে নিউ মার্কেটের দোকানে দোকানে সিডিসহ ম্যাগাজিন, কি যে দারুন অনুভূতি! ইচ্ছে করছিলো রাস্তার সবাইকে ডেকে ডেকে দেখাই!” - এভাবেই সে সময়কার অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন মেহেদী।

ওমিক্রন ল্যাবের নামকরণঃ

প্রথম দিকে অভ্রর সাইটের নাম ছিলো ওমিক্রন ল্যাব। যেটা মেহদীর মাথায় এসেছিলো মূলতঃ মুহম্মদ জাফর ইকবালের বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস “ওমিক্রনিক রূপান্তর” থেকে। লেজের সঙ্গে ’ল্যাব’ শব্দটা যুক্ত হয়েছিলো একটা ভারিক্কি-সিরিয়াস ভাব আনার জন্য, এ কথা মেহদী নিজেই বলেছেন।

প্রথম ওয়েব সাইট ডোমেইনটা কেনা হয় এক প্রবাসী মামাকে অনুরোধ করে। মামা দেশে এসে বিয়ে করেছিলেন, সেই বিয়ের ছবি তুলে দেবার দায়িত্ব ছিলো মেহদীর ঘাড়ে। ওমিক্রন ল্যাব নামে যে সাইটটা বানানো হয়, সেটাতে সেই ছবিগুলোও আপলোড করে দেয়া হয় মামাকে খুশী করতে। তার একটু নীচে স্রেফ লেখা ছিলো ‘তুমি যদি এই সাইটে ইউনিবিজয়ের জন্য এসে থাকো, তবে এখানে ক্লিক করো।” ব্যস, আর কিছু লেখা ছিলো না। অবশ্য মামার বিয়ের ছবিওয়ালা ঐ সাইটটা অনলাইনে খুব বেশীদিন ছিলো না।

যেভাবে অভ্র টিম গঠিত হলোঃ

অভ্রের সাইটের সেই ফোরামটা অভ্র টিম গঠনে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছিলো। কারন সেই ফোরামের মাধ্যমেই অভ্র টিমের বাকী সবার সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছিলো। প্রথমে ওমরের সাথে। এলিফ্যান্ট রোডে উনার একটা সফটওয়্যার বিক্রির দোকান ছিলো, নাম ‘বাঙ্গালিয়ানা’, নিভৃতচারী ও প্রচন্ডরকমের প্রচারবিমুখ মেহদী হাসান তখন সমমনা আর কাউকে চিনতেন না সে সময়, তাই ওমর ভাইর দোকানে গিয়ে প্রায়ই আড্ডা চলতো। মূলতঃ সেখান থেকেই টিমের সূত্রপাত।

বাঙ্গালিয়ানায় আড্ডা দিতে গিয়ে এরপর পরিচয় হলো রিফাতের (রিফাত-উন-নবী) সঙ্গে, যে রিফাত অভ্রের ম্যাক ভার্সন বানিয়েছে। সিয়াম (তানবিন ইসলাম সিয়াম) আর শাবাব (শাবাব মুস্তফা) এর সাথে পরিচয় অভ্রের ফোরামের মাধ্যমে। সিয়াম অভ্র টিমে ঢুকেই বানিয়ে ফেল্ল ’কাল পুরুষ’ আর ‘সিয়াম রূপালি’ নামে দুটো ফন্ট। এ দুটো ফন্ট শুধুমাত্র অভ্রের জন্যই বানানো হয়েছিলো। ভারত থেকে একটা ছেলে এসেছিলো ফোরামে, নাম নিপন। ফোরামের অন্যতম মডারেটর হয়ে যায় সে। অনেক পরে সারিম যোগ দেয় টিমে। সে অভ্রের বর্তমান ওয়েব সাইট আর অভ্রের লিনাক্স ভার্সন বানায়। এমনকি মেহদীর স্ত্রী সুমাইয়া নাজমুনও প্রায় দেড় লাখ শব্দ সম্পাদনা করেছিলেন অভ্রর ডিকশনারীর জন্য।

২০০৭ সালে 'অভ্র কীবোর্ড পোর্টেবল এডিশন' বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্যে উন্মুক্ত করা হয়। অভ্রের সোর্স কোড উন্মুক্ত, অর্থাৎ যে কেউ চাইলেই গিটহাব রিপোজেটরি থেকে এর উন্নয়নে অংশগ্রহন করতে পারবেন। উল্লেখ্য, ভার্সন ৫ এর পর থেকে অভ্রকে ফ্রিওয়্যার থেকে ওপেনসোর্সে রূপান্তর করা হয়। এবং এটি ’মজিলা পাবলিক লাইসেন্স’এর অধীনে লাইসেন্সকৃত।

অভ্রের স্বীকৃতিঃ

১) মাইক্রসফটের অনলাইন সংগ্রহশালায় ইন্ডিক ভাষাসমূহের সমাধানের তালিকায় অভ্র কী-বোর্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা।

২) জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কাজে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন অভ্র ব্যবহার করে।

৩) অভ্রকে বাংলা কীবোর্ড রিসোর্স হিসেবে ইউনিকোড সংস্থার ওয়েব সাইটে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

৪) বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস বা বেসিস বাংলা তথ্য প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য অভ্রটিমকে-কে ২০১১ 'বিশেষ অবদান পুরষ্কার' (Special Contribution Award) প্রদান করে

এছাড়াও, মেহদী ব্যাক্তিগতভাবে ২০১৬ সালের সেপ্টেস্বরে Top Ten Outstanding Young Persons পুরস্কার লাভ করেন।

পরিবার ও ব্যাক্তিগত জীবনঃ

মেহদী হাসান খান একজন দায়িত্ববান স্বামী এবং একজন স্নেহপরায়ন পিতা। তার ছেলের নাম ’অর্ক হাসান খান’। ব্যক্তিগতভাবে মেহদী অতি নিভৃতচারী, বিনয়ী, অত্যন্ত স্বল্পভাষী ও প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। অনেকেই হয়তো জানেন না, মেহদী একজন অসাধারন চিত্রগ্রাহক। তার ফটোগ্রাফির হাত দুর্দান্ত রকমের ভালো। ফ্লিকরে তার একটি একাউন্ট রয়েছে, যদিও সম্প্রতী তিনি তার সকল ছবি ব্যক্তিগত এক কারণে লোকচক্ষুর আড়াল করে রেখেছেন।

মেডিক্যাল কলেজ থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে পাশ করে বের হলেও তিনি নামের আগে কখনো ডাঃ বসাননি। কারন তিনি পেশায় একজন প্রোগ্রামার, বর্তমানে আছেন ’ব্যাকপ্যাকে।’ প্রোগ্রামিং তার নেশা, অবসেশন। তিনি জাভাস্ক্রিপ্ট কোড লেখায় বিশেষভাবে দক্ষ। শেষ করছি, প্রোগ্রামিং আর মানব কল্যান নিয়ে তারঁ নিজের চমৎকার কিছু কথা দিয়ে।

”ক্লাস নাইনে ওঠার পর বইপত্র যোগাড় করে প্রোগ্রামিংটা শেখার পর আর অন্যদিকে তাকানো হয়নি, এখনো লেগে আছি। কম্পিউটার আর ইন্টারনেট থাকলে আমার আর কিছুর দরকার হয় না। দিনশেষে মনে হয়, প্রোগ্রামিংটা বেশ ইন্টারেস্টিং, অনেকটা সুপার পাওয়ারের মতো। তবে তার চাইতেও অনেক বেশী ইন্টারেস্টিং হলো, সেই সুপার পাওয়ার দিয়ে মানুষের কাজে লাগে এমন কিছু বানাতে পারা। যারা সেই মজা পেয়েছেন ও ভবিৎষতে পাবেন, তাদের জন্য আমার ভালোবাসা রইলো।”

মেহদী হাসান খান

একুশে পদকের দাবীঃ

অভ্রের জন্য একুশে পদকের দাবী জানানো হচ্ছে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই। এই দাবীর শুরুটা হয়েছিলো বাংলা ব্লগে। এমনকি প্রতি বছরই ফেসবুক ও কমিউনিটি ব্লগগুলোতে অসংখ্য পোষ্ট আসে অভ্রকে একুশে পদক দেবার দাবী জানিয়ে। এবং এই দাবীটা অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত।

কারণ, বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বাংলা লেখার জন্য যতগুলো কি বোর্ড লে আউট ব্যবহার করে, তার ভেতর সবচাইতে জনপ্রিয় এবং সবচাইতে বহুল ব্যবহৃত কি বোর্ড হচ্ছে অভ্রের ফনেটিক কি বোর্ড। এর জনপ্রিয়তার মূল কারন হলো, অন্যান্য প্রচলিত বাংলা লে আউটের মতো এটার লে আউট মুখস্ত করতে হয় না। ইংরেজী অক্ষর চেপেই বাংলা অক্ষর টাইপ করা যায়। যেমনঃ Ami bhat khai টাইপ করলে লেখা হবে 'আমি ভাত খাই।’ সুতরাং, অভ্রের মাধ্যমে যে কেউ যে কোন সময়েই দুয়েক মিনিটের চর্চাতেই বাংলা টাইপিংয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন। অভ্র ছাড়া এত সহজে আর এত অল্প সময়ে এত নিখুঁতভাবে বাংলা লেখা হয়তো কোনভাবেই সম্ভবপর হয়ে উঠতো না। অভ্র দিয়ে অনলাইন কিংবা অফলাইন, উভয় জাগাতেই সমান দক্ষতায় বাংলা টাইপিং সম্ভব। আরেকটি বড় দিক হচ্ছে, এটা একেবারেই বিনামূল্যে পাওয়া যায়। কোন টাকা পয়সা খরচ করতে হয় না।

মেহদী ক্রমাগত বছরের পর বছর ধরে শ্রম আর অধ্যবসায় দিয়ে অভ্রকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। সে এই পৃথিবীকে যেটা দিয়েছে, তা হচ্ছে মুক্তি, স্বাধীনতা। বাংলা লেখার স্বাধীনতা।

তাই মেহদীর অভ্র -এর স্লোগান,

"ভাষা হোক উন্মুক্ত"।

উন্মুক্ত এই সফটওয়্যার বাঁচিয়েছে সরকারের কোটি কোটি টাকা। সরকারী দপ্তরগুলোতে অভ্র ব্যবহার হয়। নির্বাচন কমিশন ব্যবহার করে আমার আপনার পরিচয়পত্র বানাচ্ছে,পাসপোর্ট বানাচ্ছে,সরকারী ফাইলে হচ্ছে লেখা। সবকিছুর মূলে ছিলো মেহদীর সেই এক রুমের পৃথিবী, একটা ছোট্ট কম্পিউটার আর পর্বতসম স্বপ্ন। এবং তার স্বপ্নকে সে বিনামূল্যে ছড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীময় সমস্ত বাংলাদেশীর কাছে।

অভ্র আমাকে বাংলায় লেখার স্বাধীনতা দিয়েছে। খুব সম্ভবত আপনাকেও। এই স্বাধীনতা দেয়ার জন্য মেহদী কিংবা অভ্রের কিছু প্রাপ্য। প্রাপ্য সরকারের কাছেও। তীব্র প্রচারবিমুখ আর বিনয়ী ছেলেটার স্বপ্নটাকে একটা রাষ্ট্রীয় পুরস্কার কি দেয়া যায়না? একুশে পুরস্কার অভ্র’র করুণা নয়, পাওনা। এবং এই পাওনার দায় আমাদের মাথার উপর ঝুলে আছে গত প্রায় এক দশক ধরে। এখন সময় এসেছে এই পাওনা শোধ করে দায়মুক্ত হবার।

(তথ্যের জন্য কৃতজ্ঞতাঃ বাংলা উইকিপিডিয়া, বাংলাদেশ ওয়েব পোর্টাল, মাসিক বিজ্ঞানচিন্তা, বিভিন্ন সময় প্রকাশিত ব্লগ ও সংবাদ কলাম, এবং মেহদীর মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র ভাই ’মানিক চন্দ্র দাস’)

বিডিবিএস 

 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।