বিশ্বকাপ জয়ের মিশনে বাংলাদেশ


Dhaka
Published: 2020-02-09 08:09:20 BdST | Updated: 2020-02-29 02:32:04 BdST

বিশ্বকাপে এর আগে কখনো শিরোপা জয় তো দূরের, ফাইনালও খেলেনি বাংলাদেশ। হোক না বয়সভিত্তিক দলের বিশ্বকাপ; বাংলাদেশ যে এবারই প্রথম যেকোনো ধরনের বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠেছে! সাকিব আল হাসান-মুশফিকুর রহিম কিংবা মেহেদী হাসান মিরাজ-আফিফ হোসেনরা যা পারেননি, তা পেরেছেন আকবর আলীরা। এমন উল্লাস তো তাদের কমই হয়ে যায়! তবে সেই উল্লাসে খানিক শঙ্কাও আছে।এবার ভারতকে হারাতে পারলেই দেশের ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারবে আকবর আলীরা।

সেমিফাইনালে না হয় হারিয়ে দেয়া গেল নিউজিল্যান্ডের যুবাদের। কিন্তু ফাইনালে যে অপেক্ষায় ভারত। সেখানে ‘ভারতজুজু’ নামের এক অস্বস্তি যে ভর করে আছে। তা কাটানোর লড়াইটা রোববার। তাও অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে; দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে।

সামনে এখন আরেকটি ইতিহাস গড়ার হাতছানি যুবা টাইগারদের সামনে। দক্ষিণ আফ্রিকায় অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতকে হারাতে পারলেই প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পাবে বাংলাদেশ। দেশের ক্রিকেটপ্রেমী মানুষদের সেই আনন্দের উপলক্ষ্য এনে দিতে প্রস্তুত যুবা টাইগাররা।

রোববার (০৯ ফেব্রুয়ারি) পচেস্ট্রুমে ভারতীয় যুবাদের বিপক্ষে ফাইনালের আগে নতুন ইতিহাস গড়ার ইঙ্গিত দিলেন আকবর আলী। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক ক্রিকইনফো’কে বলেন, ‘আমরা এই ফাইনালকে (অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ) স্বাভাবিক ম্যাচ হিসেবে নিচ্ছি। ফাইনাল ম্যাচ খেলার জন্য ছেলেরা সত্যি অধীর হয়ে আছে। ঘরে ট্রফি নেওয়ার জন্য এটা আমাদের জন্য খুবই ভাল সুযোগ।’

ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। তাদের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম বিশ্ব আসরের ফাইনাল। পুরো আসরজুড়েই দাপুটে প্রিয়াম গার্গরা। সেমিফাইনালে তো চিরপ্রতিদ্বন্দী পাকিস্তানের দেয়া ১৭৬ রান টপকে গেছে কোনো ব্যাটসম্যান আউট হওয়া ছাড়াই। পুরো আসরের কোনো ম্যাচও তারা হারেনি। তা হোক, বাংলাদেশের যুবারাও কী কম গিয়েছেন। অপরাজিত তো আকবররাও। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা। এরপর কোয়ার্টারে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা আর সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ড, কেউই প্রতিরোধও গড়তে পারেনি বাংলাদেশের যুবাদের সামনে।

সেমিফাইনালে মাহমুদুল হাসান জয়, পুরো আসরে কখনো বল হাতে রাকিবুল হাসান আবার কখনো ব্যাট হাতে তৌহিদ হৃদয়, তানজিদ হাসান তামিমরা। দল হয়ে খেলার যে মন্ত্র ছড়িয়েছেন বাংলাদেশের যুবারা, ভারত বধ তো খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়। কঠোর অনুশীলন, শৃঙ্খলা ও নিয়মিত খেলার মধ্যে থাকার কারণেই বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব- ১৯ দলের বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে মঞ্চে উঠে ট্রফি ধরার দৃশ্য দেখার যেন এখন দেশের মানুষের অপেক্ষার সীমারেখা। বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ সুজন জানিয়েছেন, আকবর আলীর যুব দল দেশের ইতিহাসে সেরা। এবার তাদের বিশ্বসেরা হওয়ার পালা।

দল হয়ে খেলার ব্যাপারটা সবিস্তারে বলা যাক একটু। বাংলাদেশ খেলছে ফাইনালে, অথচ চলতি যুব বিশ্বকাপের সেরা ১৫ রান সংগ্রাহকের তালিকাতেই নেই কোনো টাইগার ব্যাটসম্যান। ৫ ইনিংসে ৫৮.৬৬ গড়ে সেখানে ১৬তম স্থানে আছেন মাহমুদুল হাসান জয়, করেছেন ১৭৬ রান। বোলারদের তালিকায় ৪ ইনিংসে ১১ উইকেট নিয়ে ৯ নম্বরে স্পিনার রাকিবুল হাসান।

ব্যাট হাতে সেঞ্চুরি করে বাংলাদেশকে ফাইনালে নিয়ে যাওয়ার নায়ক জয় তো বলেই দিয়েছেন, আমরা আমাদের স্বাভাবিক খেলাটাই খেলব। ফাইনাল বলেই বাড়তি চাপ নেবো এমন না। ফাইনাল বলে যে বাড়তি চাপ নিতে হবে, তেমন কিছু না। ভালো কিছুই হবে। চাপহীন ক্রিকেট খেলার মন্ত্রে উজ্জীবিত বাংলাদেশের মধ্যে তাও রয়ে যাচ্ছে ভারত নিয়ে অস্বস্তি। ফাইনালের লড়াইয়ে নামার আগে এটাই যেন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। গত বছরই তো এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতকে গুঁটিয়ে দেয়া গিয়েছিল কেবল ১০৬ রানে। সহজেই জয় পাওয়ার কথা তৌহিদ হৃদয়দের। কিন্তু কিসের কী, বাংলাদেশ এই ম্যাচেও হেরে গেছে ৫ রানে।

বড় হোক কিংবা ছোট, নারী অথবা পুরুষ। ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি কোন ফরম্যাটেই এর আগে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেনি বাংলাদেশ; এবারই প্রথম, আকবরদের কল্যাণে। সেমিফাইনালের একাদশ ফাইনালেও অপরিবর্তিত থাকার ইঙ্গিত বাংলাদেশের, এমনকি ভারতেরও। ওই ১১ জনের বাংলাদেশের ক্রিকেটের উপলক্ষটা বিশাল, যাকে রঙিন করে দেয়ার দায়িত্বটাও যারা এখানে পৌঁছেছেন তাদেরই।

উৎসবের আবহ নিশ্চয়ই তখন পচেফস্ট্রুম থেকে আঁচড়ে পড়বে বাংলার আনাচে-কানাচে। রাতের ঝিঁঝিপোকার ডাক ছাপিয়ে যাবে বিজয়োল্লাসের চিৎকার। খানিক সময়ের জন্য হয়তো স্তব্ধ হয়ে যাবে ব্যস্ত সড়ক। শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ সবাই মাতবেন বিশ্বজয়ের আনন্দে। তাতে থেমে যাবে ভারতের দম্ভ। চূর্ণ হবে ‘ফাইনালে ভারতকে হারানো সম্ভব না’ এই অপবাদ। মিথ্যা হবে ঋদ্ধিমান সাহার বলা কথা ‘প্রতিপক্ষ যেই হোক, তাদের জাস্ট উড়িয়ে দাও।’ তবে তার জন্য লড়াইটা করতে হবে বাইশ গজে, বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে।

যুব বিশ্বকাপ থেকেই ক্রিকেট অঙ্গনে নিজের আগমনী বার্তা জানিয়ে রেখেছিলেন মি. ডিপেন্ডেবল খ্যাত মুশফিকুর রহিম। তার দেয়া পরামর্শ- শান্ত থাক। আরও একটি বড় ধাপ পাড়ি দিতে হবে জুনিয়র টাইগাররা। এগিয়ে যাও বাংলাদেশ। জুনিয়র টাইগারদের নির্বাচক হাসিবুল হোসেন শান্ত বলেছেন, সেমিফাইনাল ম্যাচ নিয়ে যা একটু নার্ভাস ছিল ছেলেরা। নিউজিল্যান্ডকে হারানোর পর সবার ভেতরে এই বিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তারা ফাইনালেও পারবে। ছেলেগুলো খুবই স্কিলড। ভালো কোচিং স্টাফের অধীনে লম্বা সময় ধরে খেলায় বেসিকটা মজবুত। বেশ কয়েকজন অলরাউন্ডার আছে দলে। এ কারণে কার্যকর বোলিং হচ্ছে। প্রতিপক্ষ দলের ব্যাটসম্যানদের চাপে ফেলার কৌশল জানে। অধিনায়ক আকবরের বোলার পরিবর্তন এবং ফিল্ডিং সেটআপ দারুণ। সব মিলে দলটা ভালো প্যাকেজ। ফিটনেস লেভেল উঁচুতে। তাই মনের জোরও বেশি। ভারতকে তারা ছাড়বে না।

অধিনায়ক আকবর আলীর সাফ কথা, সেমিফাইনাল জয়ের পর আমরা স্বাভাবিক আছি। মাটিতেই পা আছে। আমরা এসেছি ট্রফি জিততে। আর এক ধাপ অতিক্রম করতে হবে। প্রক্রিয়া ঠিক রেখে ভালো ক্রিকেট খেলতে পারলেই হবে। আমরা অপ্রয়োজনীয় চাপ নিতে চাই না। ভারত ভালো দল। আমরা তিন বিভাগেই সেরাটা খেলতে চাই। আমাদের দর্শকরা ক্রিকেটের প্রতি নিবেদিত। তাদের উদ্দেশে বলবো, এতদিন যেভাবে সাপোর্ট দিয়ে গেছেন, ফাইনালেও একইভাবে সাপোর্ট করবেন।

বল হাতে ভূমিকা রাখতে হবে রাকিবুল-শরিফুলদের, ব্যাট হাতে জয়-হৃদয়-আকবরদের। তারও আগে খেলতে হবে দল হয়ে। সব বিভাগে নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দেখাতে হবে। তাহলেই লেখা হয়ে যাবে ইতিহাস, টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া মাতবে বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে। না পারা গেলে হয়তো খানিক নীরবতা নেমে আসবে চারপাশে। মুষড়ে পড়তে হবে অল্প সময়ের জন্য, অশ্রুও গড়াবে হয়তো চোখ বেয়ে। তবে তাতে কোনো গ্লানি থাকবে না। আকবরদের বীরত্বে ভাটা পড়বে না এতটুকু। তারা হয়ে থাকবেন ‘বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন।’

প্রখ্যাত ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার ও বিশ্লেষক এবং সাবেক ইংলিশ ক্রিকেটার অ্যালান উইলকিন্স বাঘ শাবকদের শেষ চারে পৌঁছানোর পর জোরালোভাবে দাবি কিউই সমর্থকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ফাইনালে খেলবে বাংলাদেশ। ফাইনালে এসে এমন কথা হয়তো কারোর পক্ষে বাজি রেখেই বলা সম্ভব নয়। সেমিফাইনাল জয়ের পর টাইগাররা প্রতিজ্ঞা করেছেন, শিরোপা জিতেই তারা আনন্দ করবেন। ক্রিকেটারদের মতো টিম ম্যানেজমেন্টও বিশ্বাস করছে, যুবারা এবার বিশ্বকাপ জিতবেই। একইসঙ্গে ১৬ কোটি মানুষের গহীন হৃদয়টাও যেন বলছে- দুঃখিত ভারত, বিশ্বকাপ জিতবে বাংলাদেশ!

রোববার (৯ ফেব্রুয়ারি) পচেফস্ট্রুমে ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টায়। এই ম্যাচটি গাজী টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করবে।