মুক্ত সাকিব আল হাসান


Dhaka
Published: 2020-10-29 12:29:55 BdST | Updated: 2020-11-27 20:25:59 BdST

সেই সাকিবের হঠাৎ নিষিদ্ধের ঘটনায় যেন ক্রিকেটবিশ্বই স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। ভক্তরাও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যান। সাকিব ছাড়া দেশের ক্রিকেটও পথ হারিয়ে ফেলতে বসেছে! যদিও এক বছরে খুব বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেনি বাংলাদেশ। তার পরও যে কটি ম্যাচে সাকিবকে ছাড়া মাঠে নেমেছে পরিষ্কার অভাব বোঝা গেছে।

বিশ্বকাপ শেষ! কিন্তু ইংল্যান্ড প্রথমবারের মতো ৫০ ওভারের বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় রেশটা ছিল বেশ ভালোভাবেই।

দুই মাসের টানা ধকল শেষে বিশ্বকাপ কাভার করতে যাওয়া সাংবাদিকরাও লন্ডন শহরের আশপাশটা ঘুরে দেখছেন। ঘুরতে ঘুরতে চলে যাই পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেট জেলার লাইম হাউসে। ‘নৌকায় সংসার’ দেখতে। টেমস নদীর তীর ঘেঁষে সেখানে বছরের পর বছর কিছু পরিবার নৌকায় বসবাস করছে। পরিচয়ের শুরুতে ‘বাংলাদেশ’ নাম শুনেই তাদের কয়েকজন বলে উঠলেন, ‘উফ্, সাকিব আল হাসান কি দুর্দান্তই না খেললেন!’ একজন বললেন, ‘ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় খুব খুশি লাগছে, কিন্তু আমি সাকিবের ফ্যান হয়ে গেছি!’

নিজের পারফরম্যান্স দিয়েই সাকিব আল হাসান দেশের বাইরেও নিজস্ব একটা ফ্যান-জোন তৈরি করে ফেলেছেন। দেশ স্বাধীনের পর হয়তো হাতে গোনা কয়েকজন খেলোয়াড়ই এমন কৃতিত্ব দেখাতে পেরেছেন।

বিশ্ব ক্রিকেটের রেকর্ডবুকে বেশ কিছু অধ্যায় যুক্ত করেছেন সাকিব। তার অন্যতম- তিনি ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে তিন ফরম্যাটেই আইসিসি র‌্যাঙ্কিংয়ে সেরা অলরাউন্ডার হয়েছেন।

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের (এমসিসি) সদস্য হয়েছেন সাকিব। ২০১৯ বিশ্বকাপে সাকিব যেন সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে যান। ওই আসরে বাইশগজে ব্যাট হাতে যেমন প্রতিপক্ষের বোলারদের নাস্তানাবুদ করেছেন, তেমনি বল হাতেও নাজেহাল করেছেন প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের।

সেই সাকিবের হঠাৎ নিষিদ্ধের ঘটনায় যেন ক্রিকেটবিশ্বই স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। ভক্তরাও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যান। সাকিব ছাড়া দেশের ক্রিকেটও যেন পথ হারিয়ে ফেলতে বসেছে! যদিও এক বছরে খুব বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেনি বাংলাদেশ। তার পরও যে কটি ম্যাচে সাকিবকে ছাড়া মাঠে নেমেছে পরিষ্কার অভাব বোঝা গেছে।

সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের সেরা বোলার, সেরা ব্যাটসম্যান, সেরা ফিল্ডার।

তিনি ছিলেন টেস্ট ও টি-২০ অধিনায়ক।

গত এক বছরে সাকিবের জায়গা পূরণের জন্য পারফেক্ট কাউকে খুঁজে পায়নি বিসিবি। ‘অলরাউন্ডার’ সাকিব অনন্য, কিন্তু দুই অধিনায়কের পদেও তো সেরা বিকল্প আসেনি। টেস্টের দায়িত্ব পেয়ে মুমিনুল হক দলে খুব একটা আশা দিতে পারেননি। তার নেতৃত্বে পাকিস্তান ও ভারত সফরে মুখ থুবড়ে পড়েছে বাংলাদেশ দল। বড় বড় ব্যবধানে পরাজয়। চার টেস্টের মধ্যে একমাত্র জয় ‘পুঁচকে’ জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে। সাকিবের কাছ থেকে টি-২০-এর দায়িত্ব পেয়ে মাহমুদুল্লাহ ভারতকে হারিয়ে দারুণ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি।

সাকিবের যে দৃঢ়চেতা মানসিকতা তা দেখা যায়নি মুমিনুল কিংবা মাহমুদুল্লাহ কারও মধ্যেই।

সে যাই হোক, দুশ্চিন্তা শেষ! আজ থেকে মুক্ত সাকিব আল হাসান। ক্রিকেট সম্রাট ফিরছেন তার সাম্রাজ্যে!

বিশ্ব ক্রীড়ায় অনেক কিংবদন্তিতুল্য খেলোয়াড়ই নিষিদ্ধ হয়েছেন। আবার ফিরেছেনও দাপটের সঙ্গে। তার বড় উদাহরণ অস্ট্রেলিয়ার দুই তারকা ব্যাটসম্যান স্টিভ স্মিথ ও ডেভিড ওয়ার্নার। কিন্তু জাতীয় দলে দুই তারকার প্রত্যাবর্তনটা মোটেও সহজ ছিল না। দলে জায়গা করে নিতে দুই ক্রিকেটারকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে।

সাকিবও কঠোর পরিশ্রম করেছেন। হয়তো আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি প্রত্যয়ী। কিন্তু গত এক বছরে সাকিবকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো কোনো ক্রিকেটার কি তৈরি করতে পেরেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড?

তরুণদের জন্য দারুণ একটা সুযোগ ছিল সাকিবের অনুপস্থিতিতে তার যোগ্য বিকল্প হিসেবে নিজেকে মেলে ধরা। কিন্তু কেউ কি তা পেরেছেন?

সাকিবহীন এক বছরে দেশের ক্রিকেট কতটা সাফল্য পেয়েছে?

এক বছর খেলার বাইরে। তাই সাকিব নিজে নিজে যত পরিশ্রমই করুন না কেন তার ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে! তা ছাড়া পারফরম্যান্সের বিষয়টি তো আছেই। আলোচনা হতে পারে সাকিবের ‘ভুল’ নিয়েও। যে কারণে সাকিব এক বছর নিষিদ্ধ থাকলেন, এই সময়ে আদৌ তার বোধোদয় হয়েছে কিনা বা ভুল থেকে সত্যিই শিখেছেন কিনা?

বিকল্প তৈরি করতে পারলে সাকিবের ফেরার চ্যালেঞ্জটা আরও জোরালো হতো। পরীক্ষায় পাস করেই তাকে নিজের জায়গা নিতে হতো। হয়তো সাকিবও তাই চেয়েছিলেন। কঠিন পরীক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুতও করেছেন। ফিটনেস ধরে রাখতে অনেক কষ্ট করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, ফিরতে সাকিবকে কি আদৌ কোনো পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হচ্ছে?

এ প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই যে নিহিত সাকিবহীন এক বছরে দেশের ক্রিকেটের সাফল্য-ব্যর্থতা!

সাকিবহীন এক বছর

সাকিবকে ছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের মোট ৩৬টি ম্যাচ (টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-২০ মিলিয়ে) খেলার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে করোনাভাইরাসের কারণে অনেক খেলাই আর মাঠে গড়ায়নি। সাকিব মাত্র চারটি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও সাতটি টি-২০ ম্যাচ (মোট ১৪টি) খেলতে পারেননি।

ভুল

ভারতীয় জুয়াড়ি দীপক আগারওয়াল ২০১৮ সালে ত্রিদেশীয় সিরিজ চলার সময় সাকিবের সঙ্গে দুবার যোগাযোগ করেন (১৯ ও ২৩ জানুয়ারি)। আইপিএলেও ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য এই জুয়াড়ি সাকিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু সাকিব এই বিষয়টি আইসিসি বা বিসিবির দুর্নীতি দমন বিভাগকে জানাননি।

শাস্তি

ফিক্সিংয়ের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে সাকিব আইসিসির দুর্নীতি দমন আইনের ২.৪.৪ ধারা ভঙ্গ করেন। ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি ও ২৭ আগস্ট জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ভুল শিকার করেন। পরবর্তীতে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ হন সাকিব। এর মধ্যে এক বছর ছিল স্থগিত