বৃহস্পতিবার, মার্চ ৩০, ২০১৭
UCC-LOGO1

জালিয়াতির অভিযোগে ঢাবিতে ভর্তি হতে না পারা সেই ছাত্রীকে রাবিতে ভর্তি তার নাম তাজরিন আহমেদ খান মেধা

kuikui

রাবিঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ‘ঘ’ ইউনিটে মেধা তালিকায় স্থান পেয়েও জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বাদ পড়া সেই ছাত্রীকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) আইন বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে।আইন অনুষদভুক্ত ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৫৫ দশমিক ৫০ নম্বর পেয়ে ৪৪তম মেধা স্থান অর্জন করে তাজরিন আহমেদ খান মেধা নামের ওই ছাত্রী।মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মেধা তালিকায় প্রথম ধাপে গত ৮ ডিসেম্বর ভর্তি হয় সে।

তবে খোদ আইন অনুষদের ডীন ও ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আবু নাসের মো. ওয়াহিদ বলছেন, ‘তার বিষয়ে এখনও আমাদের সন্দেহ রয়েছে।তবে কোনো অভিযোগ বা প্রমাণ হাজির না করতে পারায়, নিয়ম অনুযায়ী তাকে বাদ দিতে পারিনি।ধারণা করছি- অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সে জালিয়াতি করে থাকতে পারে।যা হয়তো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবির) আইসিটি সেন্টারের আওতার বাইরে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাবির আইন অনুষদভুক্ত ‘বি’ ইউনিটের জোড় রোলধারী হিসেবে গত ২৪ অক্টোবর বেলা ১১টা থেকে ১২টায় অনুষ্ঠিত ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয় তাজরিন।

তার রোল নম্বর ১৯২৪২। ৮০ নম্বরের এমসিকিউ এবং ২০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা হয়। বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে ১০ করে ২০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় পৃথকভাবে কমপক্ষে ৪ নম্বর না পেলে ফেল বলে গণ্য হবে। লিখিত পরীক্ষায় পাশ করা সাপেক্ষে এমসিকিউ উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। লিখিত পরীক্ষায় পাশ এবং এত শর্ত পূরণ করে এমসিকিউ পরীক্ষার নম্বরসহ তাজরিন সেখানে পায় ৫৫ দশমিক ৫০।তার মেধা স্থান হয় ৪৪, মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে সবশেষ ৩২তম হিসেবে সে ভর্তি হয়।অথচ আইন অনুষদভুক্ত ‘বি’ ইউনিটের চেয়ে তুলনামূলক সহজ আরও তিনটি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল তাজরীন।এর মধ্যে দুটি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করেছে সে।বিজনেস স্টাডিজ অনুষদভুক্ত ‘ডি’ ইউনিটের অ-বাণিজ্য শাখায় (রোল: ৫২০০৪) ১০০ এর মধ্যে পেয়েছে মাত্র ১৪ দশমিক শূন্য ৬। কৃষি অনুষদভুক্ত ‘জি’ ইউনিটে (রোল: ২১৪৭১) পরীক্ষায় পেয়েছে ৩৩ দশমিক ২৫ নম্বর। আর রাবির ভর্তি পরীক্ষায় সবচেয়ে সহজ প্রশ্নপত্র হয় যে কলা অনুষদভুক্ত ‘এ’ ইউনিটে, সেখানে তালিকায় ২২৯৭ তম হয়েছে সে।‘এ’ ইউনিটে ভর্তির জন্য ৭ বার তালিকা দেয়া হলে তাজরীন মেধা তালিকায় আসতে পারেনি।

ঢাবি সূত্র জানায়, ঢাবির ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় তাজরিন আহমেদ খান মেধা ৫ম ও তার আত্মীয় নুর মাহফুজা দৃষ্টি (নিপু) ৭৮তম স্থান অর্জর করেন। কিন্তু জালিয়াতি করে মেধা তালিকায় স্থান পাওয়ার অভিযোগ ওঠে তাদের দুজনের বিরুদ্ধে।অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঢাবি কর্তৃপক্ষ তাদের দুজনের পুনরায় পরীক্ষা নেয়।এতে নুর মাহফুজা দৃষ্টি ফেল করলেও মেধা কোনো মতে পাস করে যায়।তবে পাস করলেও ভর্তি যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয় তাজরীন।

ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় নয় লাখ টাকার বিনিময়ে চান্স পাওয়া, পরে অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুনরায় পরীক্ষা নেয়া।তাতেও বাদ পড়ে রাবির আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ায় বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।তারা ওই ছাত্রীর পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. মজনু মিয়া বলেন, ওই ছাত্রীর বিষয় নিয়ে গোটা দেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিলো।যেহেতু সন্দেহ রয়েছে, তাই কর্তৃপক্ষের উচিত সন্দেহ দূর করা। পুনরায় পরীক্ষা নিয়ে হোক বা অন্য কোনো উপায়ে।সেটার সবচেয়ে ভালো উপায় ভর্তি কমিটি এবং শিক্ষকরা জানেন।আমরা চাই বিভাগে বিতর্কিত কেউ যাতে ভর্তির সুযোগ না পায়।

রবিউল ইসলাম নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ঢাবিতে তার জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণ হয়েছে অথচ পুনরায় পরীক্ষা না নিয়ে রাবির আইন বিভাগ তাকে ভর্তি করলো।এতে বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে আমি মনে করি।তাকে পুনরায় পরীক্ষা নিয়ে ভর্তি করা হোক।

বিভাগের চারজন সিনিয়র অধ্যাপকের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, ওই ছাত্রীর আচার-আচরণ সবকিছুতে সন্দেহ মনে হয়েছে।স্বচ্ছতার বিষয়ে রাবির আইন বিভাগের বেশ সুনাম রয়েছে।কিন্তু ঢাবিতে ওই ছাত্রীর জালিয়াতি করার ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় দেশব্যাপী তা আলোড়ন সৃষ্টি করে।আবার রাবির অন্য দুটি সহজ ইউনিটে সে পাস করেনি।ফলে তাকে পুনরায় পরীক্ষা নিয়ে ভর্তি করানো উচিত, অন্যথায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে আইন বিভাগ। ক্লাসে সহপাঠী ও শিক্ষকদেরও তার প্রতি খারাপ দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে।যা শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হতে যথেষ্ট।

আইন অনুষদের ডীন অধ্যাপক আবু নাসের মো. ওয়াহিদ বলেন, মৌখিক পরীক্ষার পর তাকে যাচাই-বাছাই করার জন্য বোর্ড গঠন করা হয়েছিল।ভর্তি পরীক্ষায় যে প্রশ্নে সে পরীক্ষা দিয়েছিল, সেখান থেকে এলোমেলোভাবে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল।যেগুলো সে পরীক্ষায় সঠিক করেছে, এখানেও সঠিক করায় তাকে ভর্তির জন্য বোর্ড সুপারিশ করে।ফলে আমরা তাকে ভর্তি করেছি।

তবে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে যাচাই প্রক্রিয়া হাস্যকর বলছেন বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপকরা।তারা জানান, তিন মাস আগে এক দফা অনুষ্ঠিত হওয়া পরীক্ষার প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে যে কোনো প্রার্থী তার উত্তর দিতে পারবে।এটা যাচাই-বাছাই করার কোনো প্রক্রিয়া হতে পারে না। পুনরায় পরীক্ষা নিয়ে কেবল এ বিষয়ে সমাধান সম্ভব।

আর পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে আইন অনুষদের ডিন ও ভর্তি কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আবু নাসের মো. ওয়াহিদ বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ না পাওয়ায় পুনরায় পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হয়নি। আমরা রাবির আইসিটি সেন্টারের মাধ্যমে তার বিষয়ে খোঁজ নিয়েছি। ঢাবি কর্তৃপক্ষের কাছেও তার বিষয়ে তথ্য চেয়েছিলাম যে, রাবির আইন অনুষদের পরীক্ষায় সে জালিয়াতি করেছে -এমন তথ্য তাদের হাতে তদন্ত করতে গিয়ে কোনোভাবে এসেছে কিনা। কিন্তু এ ব্যাপারে কিছু পাওয়া যায়নি।’

অধ্যাপক মো. ওয়াহিদ আরও বলেন, ‘যদি সে জালিয়াতি করে এ দফায় বেঁচেও যায়, তবুও সে পড়াশোনা শেষ করে যেতে পারবে না বলে আমার বিশ্বাস। কারণ যোগ্যতা না থাকলে আমাদের সিলেবাস অনুযায়ী সে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারবে না। ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখা তার জন্য মুশকিল হবে।’

জানতে চাইলে রাবি ভিসি অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই ঘটনাটি শুনেছিলাম। ভর্তি কমিটি এখানে তাকে যাচাই-বাছাই করে ভর্তি করিয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি। যদিও এটা ওই অনুষদের ভর্তি কমিটির বিষয়। আমি বলব- সে ভর্তি হয়েছে, তার বিরুদ্ধে এখানে ভর্তি পরীক্ষায় অভিযোগ না উঠলেও পরবর্তীতে তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, ভর্তি কমিটি ও বিভাগের শিক্ষকরা সিদ্ধান্ত নেবে। সে ধরনের সুযোগ রয়েছে। ফলে তার উপর শিক্ষকদের নজর থাকবে।’

এমএসএল