বুধবার, ফেব্রুয়ারী ২২, ২০১৭
UCC-LOGO1

বিসিএস ভাইভা বোর্ডের অভিজ্ঞতা

অনিন্দ কুমার সাহাঃ এইচ.এস.সি পাশ করার পর ভর্তি পরীক্ষা নামক বিশ্বযুদ্ধে পারফরম্যান্স খুব একটা খারাপ ছিল না। ৫ টা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েছিলাম। ভর্তি হয়েছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগে। চান্স পাবার পর যখনই কেউ আমার অনুভূতি জানতে চাইত তখনই ব্যাপক ভাব নিয়ে বলতাম- “আল্লাহ বাচাইসে রে ভাই, বিসিএস পরীক্ষা দিতে হবে না।“ স্বাভাবিকভাবেই সবাই চোখ বড় করে তাকিয়ে বলত- “কেন?” আমার সহজ সরল উত্তর- “ফার্মেসীর চাকরির ক্ষেত্র আলাদা। বিসিএস না দিলেও চলে। আর বিসিএস দিতে হলে প্রচুর পড়তে হয়। আমার এত পড়ার টাইম নাই। 


BCSVIVA


বাস্তবিকই সারাটা জীবনই আমি চরম ফাঁকিবাজ টাইপের ছাত্র ছিলাম। তার উপর বিতর্ক, আবৃত্তি, মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠান এইসব নিয়ে সারা বছর ব্যস্ত থাকতাম। পরীক্ষার আগে ছাড়া পড়ার সময়টা ছিল কোথায়? ভার্সিটিতে কয়দিন পর পর শিবির-ছাত্রদল-ছাত্রলীগ কিংবা সাধারন ছাত্র-পুলিশ মারামারি লাগত। বাসায় এসে বন্ধুদের সাথে এইসব গল্প করার মজাই ছিল আলাদা। সবসময় ধান্দায় থাকতাম কিভাবে কম পড়ে ভাল ফলাফল করা যায়। আমাদের ডিপার্টমেন্টে পড়ুয়া আতেলের অভাব ছিল না। পরীক্ষার আগে যখন সবাই সারা দিনরাত পড়ে বই মুখস্ত করত, আমি তখন বিগত ৫ বছরের প্রশ্ন ঘেঁটে ঘেঁটে ১০ টা প্রশ্ন ঠিক করে রাখতাম। কপালটাও নেহায়েত মন্দ ছিল না। এগুলো থেকেই কমন পড়ে যেত। ভার্সিটিতে কেউ ফেল করে না। তাই জানতাম কোনভাবে পাশ করে একটা কোম্পানিতে জয়েন করে ফেলব। যেহেতু শিক্ষক হবার কোন ইচ্ছে ছিল না তাই এত পড়াশুনা করে যৌবন নষ্ট করার কোন কারন দেখিনি। আর বিসিএস? সেটা তো ছিল আউট অফ সিলেবাস।

আমার এইসব চিন্তাভাবনা শুনে উপরওয়ালা সম্ভবত মুচকি মুচকি হাসছিলেন আর বলছিলেন- “হে বালক, অপেক্ষা কর। সময় আসুক তারপর দেখব কত চালে কত কেজি।“

যেহেতু হোস্টেলে থাকতাম তাই প্রতিটা রুম ছিল বিসিএস পরীক্ষার্থীদের আড্ডাখানা। অনেকটা খেয়ালের বশেই প্রথমবার বিসিএস এর ফর্ম পূরণ করি। তখন মাত্রই অনার্স ফাইনাল দিয়েছি। প্র্যাকটিক্যাল চলছে তাই appeared সার্টিফিকেট নিয়ে ফর্ম পূরণ করেছিলাম। কিন্তু পরীক্ষা দেই নি কারন যেদিন পরীক্ষা ছিল সেদিন আমাদের বিতর্ক সংগঠন National Debate Federation Bangladesh (NDF BD) এর ওয়ার্কশপ ছিল খুলনায়। যেহেতু রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় সমন্বয়ক ছিলাম তাই দায়িত্বের টানে এবং সুন্দরবন ভ্রমণের লোভে পরীক্ষা বিসর্জন দিতে মোটেও খারাপ লাগে নি।

এর পরের বিসিএস এর সার্কুলার যখন হল তখন মাস্টার্স পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। বিসিএস এর জন্য পড়বার সময় কোথায়? ফর্ম পূরণ করার ইচ্ছে ছিল না কিন্তু এক বন্ধু আমাকে না বলেই ফর্ম কিনে ফেলেছিল। অতএব ফর্ম পূরণ করলাম। মাস্টার্স পরীক্ষার পর প্রজেক্ট শেষ করার ৬ দিন পর ছিল বিসিএস প্রিলিমিনারী পরীক্ষা। কোন প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগও ছিল না। দিলাম পরীক্ষা। যেহেতু বিজ্ঞানের ছাত্র তাই অংক আর বিজ্ঞান ভালই জানতাম। যেহেতু বিতর্ক করতাম, নিয়মিত পত্রিকা ও ম্যাগাজিন পড়বার কল্যানে সাধারন জ্ঞান ভালই জানতাম। আগে থেকেই বাংলার উপর ভাল দখল ছিল তাই বাংলাতে কোন সমস্যা হয় নি। আর পড়তাম ইংরেজী মাধ্যমে তাই ইংরেজীতে খারাপ করার প্রশ্নই আসে না। সবকিছুর ফলাফল দাঁড়াল প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কি করে জানি টিকে গেলাম। এতদিন কিছুই ছিল না কিন্তু প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় টিকবার সাথে সাথেই বিসিএস ক্যাডার হওয়াটা আবার আব্বাজানের প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে দাঁড়াল। এতদিন শুনিনি কিন্তু এইবার শুনলাম আমার জন্মের আগে থেকেই ছেলে বিসিএস ক্যাডার হবে এইটা নাকি আমার বাবার আজন্ম লালিত স্বপ্ন ছিল। আর সেই স্বপ্ন পূরণের পবিত্র দায়িত্ব এবার আমার উপর এসে বর্তাল।

ইতোমধ্যে একটা চাকরীতে নিয়োগ পেয়েছিলাম। সবসময় দেখে এসেছি বেকার ছেলেকে বাবা-মা চাপে রাখে যেন সে একটা চাকরী করে। আমার ক্ষেত্রেই দেখি উল্টা নিয়ম। সীমাহীন পারিবারিক চাপে জয়েন করার ২২ দিনের মাথায় জীবনের প্রথম চাকরীটা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। সে যে কি কষ্ট সেটা ভুক্তভোগীরাই জানে। কি আর করা, লিখিত পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা শুরু করলাম। লিখিত পরীক্ষার সীট পড়েছিল লালমাটিয়া মহিলা কলেজে। ১১ দিনে ৯ টা পরীক্ষা দিয়ে যারপরনাই বিরক্ত ছিলাম। রেজাল্ট বের হলে দেখা গেল কিভাবে জানি এই পরীক্ষাতেও টিকে গেছি। আমার বাবাকে আর কে পায়। গর্বে তাঁর বুকের ছাতি আরো ১৪ ইঞ্চি ফুলে গেল। মহল্লায় ফিরে দেখি আমার স্ট্যাটাস আরো বেড়ে গেছে। আমার আম্মা তো খুব খুশি। বলেন- “শুধু ভাইভা তে টিকে যা রে বাবা, তোর বিয়ের জন্য মেয়ের অভাব হবে না দেখিস।” ধরণী দুই ভাগ হও, আমি জাম্প দিমু। বিয়ের বাজারে ডিমান্ড বাড়ানোর জন্য বিসিএস যে ফাটাফাটি অস্ত্র সেটা প্রথম বুঝে আসল। আমি তো এখন বিসিএস ক্যাডার না। তারমানে কি আমার বিয়ে হবে না? এই নিয়ে খুব টেনশনে আছি।

লিখিত পরীক্ষার পরপরই জীবনের ২য় চাকরীটা পেয়ে গেলাম। নতুন চাকরীর সিমাহীন ব্যস্ততা ভাইভার জন্য পড়ার সময় আমাকে দেয় নি। যেদিন ভাইভার তারিখ ছিল সেদিনই অফিসের কাজে আমার যশোর যাবার কথা ছিল। বিকালের বাসের টিকেট করেছিলাম যেন সকালে পরীক্ষা দিয়েই ছুটতে পারি। সকাল সকাল চলে গেলাম পিএসসির অফিসে।

পিএসসির অফিসে এসে তো দেখি এলাহী কাণ্ড। অনেক খালু-খালাম্মারা পরীক্ষা দিতে এসেছেন। খালু খালাম্মা বলছি এই জন্যে বেশিরভাগেরই এটা ছিল ২য় বা ৩য় বা তারও পরেরবার বিসিএস পরীক্ষা। তারা আবার সাথে করে বড় কিংবা ছোট অভিভাবক নিয়ে এসেছে। কি হাস্যকর। একজন খালাম্মা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি পরীক্ষার্থীর কি হই। শুনেছি আমাকে দেখতে নাকি অনেক কম বয়স্ক লাগে। তাই বলে কি এত কম বয়স্কই লাগে? আমিও গম্ভীর মুখে বললাম- “জী, আমি আমার আম্মুর সাথে এসেছি।“ দৃষ্টি দিয়ে মানুষকে ভস্ম করার ক্ষমতা থাকলে আমি নিশ্চিত সেদিন পুড়ে ছাই হয়ে যেতাম। আমাকে চরম বেয়াদব একটা ছেলে ভেবে তিনি আমার পাশ থেকে উঠে চলে গেলেন। আর আমি মানসিক প্রস্তুতি নিতে থাকলাম ভাইভা দেওয়ার।

ভাইভা বোর্ডে ঢুকবার আগে প্রচণ্ড গরমে ঘামছিলাম। রুমে যখন আমার ডাক পড়ল তখন ভিতরে ঢুঁকে প্রথমেই যেই চিন্তা মাথায় আসল তা হচ্ছে আমি কি এন্টার্কটিকায় ঢুকলাম নাকি? মনে হচ্ছিল এসির তাপমাত্রা ফ্রিজিং তাপমাত্রার নিচে নামানো আছে। যারা রুমে বসে ছিলেন হয় তারা জীবনে কোনদিন এসির বাতাস খান নি কিংবা তাদের গরম ফোবিয়া ছিল বলেই আমার ধারনা।

ভাইভা বোর্ডে ছিলেন ৩ জন। তাদের মাঝে একজন সম্ভবত ছিলেন সচিব। বাকি দুইজনের একজন উপজাতি সম্প্রদায়ের (চাকমা কিংবা মারমা বলেই আমার ধারনা), আরেকজনের ব্যাপারে আমার কোন ধারনা নেই। প্রথমেই আফসোস, ইশশ উপজাতি হলে নিশ্চিত আমার চাকরী হয়ে যেত। কেন যে শালা কোন কোটা নাই সেটা ভাবতে গিয়েই মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল।

আমাকে বসতে বলা হল। বসলাম। প্রথম প্রশ্ন, “আপনার নামের অর্থ কি?”

প্রশ্নটা করা হল বাংলায়। বাংলায় উত্তর দিতে গিয়েই থামতে হল।

“আমরা আপনাকে বাংলায় প্রশ্ন করব কিন্তু আপনি ইংরেজীতে উত্তর দিবেন।“

হে হে, ভাইভা বোর্ডের কর্তা ব্যক্তিদের ইংরেজীর জ্ঞান সম্বন্ধে ধারনা হয়ে গেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। কারন ভুল ইংরেজী বললেও এরা মনে হয় ধরতে পারবে না। যাই হোক, প্রথম প্রশ্নটা কমন পড়েছিল। গড়গড় করে বলে দিলাম। শুরুটা ভাল হয়েছে দেখে আমার আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বেড়ে গেল। আসুক কোন ব্যাটা আসবে। একবারে ফাটায়া দিমু এই ভেবে নড়েচড়ে বসলাম। আমাদের কথোপকথন ছিল মোটামোটি নিম্নরূপ (যারা বিসিএস নিয়ে চরম সিরিয়াস তারা এই অংশটুকু একটু ভাল করে পড়ুন, বলা যায় না কাজে দিলেও দিতে পারে) –

“মিঃ ফাহমিদুল হান্নান রূপক, এত ক্যাডার থাকতে আপনি পররাষ্ট্রকে কেন প্রথম পছন্দ করলেন?”

“স্যার, আমার ছোটবেলা থেকেই দেশ-বিদেশ ঘুরবার ইচ্ছা কিন্তু আমার এত টাকা নেই যা দিয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরব। এই ক্যাডারে চাকরী করলে দেশ সেবার পাশাপাশি ঘুরাঘুরিটাও হয়ে যাবে। (দেশ সেবা বলার সময় ব্যাপক ইমোশনাল একটা লুক দিলাম)।“

“হুম, ভাল বলেছেন। আচ্ছা আপনি একজন ফার্মাসিস্ট কিন্তু বিসিএস দিচ্ছেন কেন? আমার জানামতে আপনারা তো ভালোই বেতন পান। তাহলে সরকারী চাকরীতে আসতে চাইছেন কেন?” (এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম যে এই প্রশ্নটা করবে। অবশ্য উত্তর তৈরি করাই ছিল)।

“স্যার, কথাটা আংশিক সত্য। ভাল কোম্পানিগুলো ভালই বেতন দেয় কিন্তু আমি যেই কোম্পানিতে আছি সেটার স্যালারি স্ট্রাকচার আমার পছন্দ না।“

“আপনি বেতন কত পান?”

এইবার পড়লাম বিপদে। সত্য কথা বললে বলবে তাহলে সরকারী চাকরি কেন করবেন আর মিথ্যে বললে নিজের কাছেই খারাপ লাগবে। বুদ্ধি করে শুধু বেসিক স্যালারি টা বললাম। সরাসরি মিথ্যাও বলা হল না আবার সত্যটাকেও লুকানো গেল।

“এত কম দেয় আপনাদেরকে?”

“জী স্যার।“ (এইবার একটা মন খারাপ লুক দিলাম।)

“বলুন ভারতকে যদি আমরা ট্রানজিট দেই তাহলে কি লাভ হবে আর কি ক্ষতি হবে? কোনটা বেশি হবে বলে আপনার ধারনা?“


মহা জ্বালা। ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ সরকার। ভারতকে সরাসরি বাঁশ দিলেও সমস্যা। এই মুহূর্তে আমার মনে তীব্র দেশপ্রেমের উদয় হল। সিদ্ধান্ত নিলাম, বাঁশ ঠিকই দিব কিন্তু একটু বুঝেশুনে দিব।


 

“লাভ হবে এটাই যে আমরা ভারতের কাছ থেকে প্রচুর শুল্ক পাব যেটা আর্থিকভাবে আমাদের লাভবান করবে। উপরন্তু নেপাল ও ভুটানের সাথে বাংলাদেশকে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া যাবে। কিন্তু আমার মনে হয় লাভের থেকে ক্ষতিই বেশি হবে।“

“কেন?”

“প্রথম কারন, ভারত তাঁদের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিদ্রোহীদের দমন করতে অস্ত্র পরিবহন করতে পারে। এর ফলে ওই বিদ্রোহীরা প্রতিশোধপরায়ন হয়ে আমাদের দেশে নাশকতা চালাতে পারে। দ্বিতীয় কারন, ছিটমহল, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যাকাণ্ড প্রভৃতি বিষয়ে ভারত বার বার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। সামনেও যে করবে না তার কোন নিশ্চয়তা নেই।“

“আপনি তো দেখছি পজিটিভের থেকে নেগেটিভ চিন্তাই করেন বেশি।“

“আমি বলছি না যে ভারত এগুলো করবেই। কিন্তু দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্ভাবনাকেও আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না।“

“এই দুইটাই কারন?”

“আরো একটা কারন বলতে পারি। ভারত হচ্ছে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এইডস রোগীদের দেশ। তাদের ট্রাক ড্রাইভারদের একটা বড় অংশ HIV (+)ve ভাইরাস বহন করছে। ট্রানজিট পেলে এইসব ড্রাইভাররা বাংলাদেশে আসবে এবং সময় কাটানোর জন্য তারা বিভিন্ন পতিতালয়ে যাবে। সেখান থেকে এইডস ছড়ানোর খুব ভাল সম্ভাবনা আছে। (এটা আসলেও সত্য কথা। এই ব্যাপারে আমি একটা প্রোজেক্টে অংশ নিয়েছিলাম তাই জানি।)

‘দারুন বলেছেন। এই ব্যাপারটা আসলেও গুরুত্বপূর্ণ।“

চাকমা যিনি বসেছিলেন তিনি ভাল ইংরেজী জানেন না তা বুঝেছিলাম। কিন্তু ভাল বাংলাও যে জানেন না সেটা তার প্রশ্ন শুনেই বুঝলাম।

“বলেন ওয়ান ফত্তি ফর কি?”

খাইছে, কি কয়? মাথার উপর দিয়ে গেল তো। আমার ডান পাশের ভদ্রলোক একটু মুচকি হেসে বললেন-

“ওয়ান ফোরটি ফোর কি জানেন?”

“১৪৪ ধারার কথা বলছেন? যে কোন স্থানে ৫ জনের বেশি একত্রিত হতে পারবে না এবং কোন মিটিং-মিছিল বা সমাবেশ করতে পারবে না।“

“EEZ কি?”

“EEZ হচ্ছে Exclusive Economic Zone. এটা হচ্ছে কোন একটা দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা।“
…………………………………………………………………………………………………………………….

কথোপকথন অনেক দীর্ঘ ছিল। এতটুকু লিখেছি আমার নিজেরই বিরক্ত লাগছে, আপনাদের পড়তেও যে বিরক্ত লাগছে সেটাও বুঝতে পারছি। আমার পরীক্ষা খুব ভাল হয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম যে আমার হবে না। প্রথম কারন আমার কোন কোটা ছিল না। যেই দেশে বিসিএস চাকরিতে ৫৫% চান্স পায় কোটাতে সেই দেশে মেধার সঠিক মূল্যায়ন কবে এবং কিভাবে হবে সেটা গবেষণার বিষয়। আর দ্বিতীয় কারন একজন প্রভাবশালী মন্ত্রির এপিএস আমার আব্বাজানের কাছে মাত্র ৩ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন আমাকে ক্যাডার(!) বানিয়ে দিবেন এই কথা বলে। আমি তো আমি, আমার বাবাও তার সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাই কিভাবে হবে?

ভাবছেন ক্ষোভে, দুঃখে এই পোস্ট দিয়েছি? মোটেই না। বিসিএস হয় নি বলে আমার কোন আফসোস নেই। একজন বিসিএস ক্যাডার এর প্রাথমিক বেতন বর্তমানে ১৭,৭০০ টাকা বা তার কিছু বেশি। বাৎসরিক বেতন বৃদ্ধি ৪৫০-৫৫০ টাকা। ২০১৫ সালে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়িত হলে পরিমাণটা আরও বৃদ্ধি পাবে। আমি এই বেতনে হয়তো চলতে পারতাম না। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই ততক্ষণ পর্যন্ত সৎ যতক্ষণ তারা অসৎ হবার সুযোগ না পায়। আমি যেহেতু ফেরেশতা নই, নিজেকে ঠিক রাখা আমার জন্য সম্ভব নাও হতে পারত। অনেকেই আছেন যারা এই বেতনেই নিজেকে ঠিক রেখে চলছেন। তাদের প্রতি আমার স্যালুট। এই দুর্মূল্যের বাজারে আপানারা সত্যিই মহান।

শিক্ষা আমাদেরকে যেমন সামাজিকতা শেখায়, তার থেকে বেশি শেখায় মুখোশধারী ভণ্ড হতে। তার থেকেও বেশি শেখায় স্বার্থপর হতে। যে যত বেশি ট্যালেন্ট, সে তত ভালভাবে চুরি করতে জানে। সে তত ভালভাবে তার দুর্নীতিকে আড়াল করতে জানে। এই স্বার্থপর সমাজে আমরা সবাই একেকজন স্বার্থপর। একেকজন মুখোশধারী ভণ্ড।

সবাই নিজেকে নিয়ে বেঁচে আছি, সবাই নিজেকে নিয়েই বেঁচে থাকতে চাই। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য, নিজের বিবেকের সাথে একটু অভিনয় করার জন্য কেউবা ব্লগে লিখি, কেউবা টকশো করি আর কেউবা চায়ের আড্ডায় গলা ফাটিয়ে ঝড় তুলি। আসলে সত্যের মুখোমুখি হতে সবাই ভয় পাই কারন আমার ভেতরের দুর্বল মানুষটার কদর্য চেহারা তখন প্রকাশ হয়ে পড়বে। তাই নিজের কাছ থেকেই নিজে প্রতিনিয়ত পালাই।

এতকিছুর পরেও, আমি সবসময় সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখি। আঁধারের পরেই আলো আসে। ৩৫ তম বিসিএস এর সার্কুলার হয়েছে। যারা বিসিএস এর জন্য কোমর বেঁধে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাদের জন্য শুভকামনা রইল।

এই লেখার সকল দায় দায়িত্ব লেখকের। ক্যাম্পাসটাইমস কোন দায় নেবে না। 

এমএল ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫