বৃহস্পতিবার, মার্চ ৩০, ২০১৭
UCC-LOGO1

ইব্রাহীম পাশার কণ্টকাকীর্ণ, বর্ণাঢ্য জীবন

প্রিন্স মোহাম্মদ সজলঃ নিজের কর্মজীবনের প্রায় প্রতিটি অধ্যায়ে চরমভাবে সফল একজন ব্যক্তি ছিলেন ইব্রাহীম পাশা। তার মেধা আর বিশ্বস্ততা সম্পর্কে সুলেইমানের ছিল অগাধ আস্থা।
১৫১৮-১৫২৩,মাত্র এই পাচ বছরের মধ্যে একজন সাধারন বাজপাখির রক্ষক থেকে তিনি পৃথিবীর সবচাইতে বড় সাম্রাজ্যের উজিরে আযমে পরিনত হন,এত বেশি ক্ষমতা এত দ্রুত সময়ে লাভ করায় পুরো সাম্রাজ্যেই তৈরি হয় তার অনেক শত্রু।
তার পুর্ববর্তী উজিরে আযম পীর ই মেহমেদ পাশার অবসর নেয়ার পর উজিরে আযম হবার কথা ছিল আহমেদ পাশা বা কারা মাহমুদ পাশা অথবা লুতফি পাশার।ইব্রাহীম তখন এমনকি মজলিসের সদস্যও ছিলেন না।সেখান থেকে হঠাৎ করে একেবারে উজিরে আযমের পদ পাওয়া ইব্রাহীম বুঝতে পেরেছিলেন তার এই আকস্মিক উন্নতি অনেক শত্রুর জন্ম দেবে।তাই তিনি সুলতানকে অনুরোধ করেছিলেন তাকে যেন এত বেশি ক্ষমতা দেয়া না হয়,কারন শত্রুরা তার জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাড়াতে পারে।
সুলতান প্রিয় বন্ধুকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন,আমি যতদিন বেচে আছি,কেউ তোমাকে স্পর্শও করতে পারবে না।
ইব্রাহীমকে সুলতান এতই বিশ্বাস করতেন যে অসংখ্যবার ইব্রাহীমের সাথে তিনি খাবারও খেয়েছেন,তখন খাবারে বিষ মেশানোর ভয়ে সুলতানরা সব সময় একা খেতেন,এমনকি নিজের স্ত্রীর দেয়া খাবারও পরীক্ষা করে খাওয়ার নিয়ম ছিল।
ইব্রাহীম সুলতানকে নিরাশ করেন নি।
একের পর এক যেখানেই তিনি গেছেন নিয়ে এসেছেন সাফল্য।
তার প্রথম মিশন ছিল মিশরের বিদ্রোহ দমন করে সেখানে অটোমানদের শাসন শক্তিশালী করা।এতে তিনি ছিলেন দারুন ভাবে সফল।
দ্বিতীয় মিশন ছিল আনাতোলিয়ার বিদ্রোহ দমন,প্রায় কোন রক্তপাত ছাড়াই এখানেও তিনি ছিলেন সফল।
এরপর তাকে দেয়া হয় জানিসারী বাহিনীর সংস্কারের কাজ,এতেও তিনি সফল।
১৫২৬ সালে বিখ্যাত মোহাচ যুদ্ধে অটোমানদের সাফল্যের একটা বড় কারন ছিল ইব্রাহীমের বুদ্ধি,ড্রাভা নদী পার হতে যেখানে এক মাস লাগার কথা সেখানে ইব্রাহীমের বুদ্ধি আর মাতরাকচী নাসুহ এফেন্দীর পরিশ্রমে তা অটোমানরা তিন দিনে পার হয়ে যায়।
যুদ্ধের সময় কামানবহর লুকিয়ে রাখার পরিকল্পনাটাও তারই ছিল।
তিনিই ভারত মহাসাগরে অভিযানের জন্য সালমান রইস কে কারাগার থেকে মুক্ত করে তার নেতৃত্বে একটা কমিটি তৈরি করেন যারা দশ বছর পর ভারত মহাসাগরে পর্তুগীজদের বিরুদ্ধে অভিযানের পরিকল্পনা ঠিক করার জন্য ব্যাপক গবেষনা চালায়।সুলতানের নির্দেশে এই কমিটিতে পরবর্তীতে আহমেদ পীর ই রইস ও কুরতোলু মুসলেহউদ্দিন রইসকেও নেয়া হয়।
ভিয়েনায় প্রথম অভিযানের সময় সুলতানকে থামাতে চেয়েছিলেন ইবরাহীম,কিন্তু একরোখা সুলেইমান শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত জয়ের আশা ছাড়তে নারাজ ছিলেন।
এই সময়ে ইবরাহীমের মাসিক বেতন সুলতান বাড়িয়ে ৩০ লাখ রৌপ্যমুদ্রায় উন্নীত করেন,যা ছিল অন্য যে কোন উজিরের চাইতে অন্তত ছয়গুন বেশি।এতে দরবারে তার শত্রুর সংখ্যা আরো বাড়ে।
সুলেইমানের জার্মানী-স্লোভেনিয়া-ক্রোয়েশিয়া অভিযানের সময় ইব্রাহীম এক মারাত্মক ভুল করেন,এই ভুলটা না করলে হয়তো পৃথিবীর ইতিহাস আজকে অন্যভাবে লেখা হত।
ইব্রাহীম কোস্যেক নামের দূর্গটা জয় করা খুব জরুরী মনে করেছিলেন,অথচ এর আসলে কোন দরকারই ছিল নাএবং দূর্গের ডিজাইন ঠিকমত বুঝতে না পেরে ভুলভাবে অবরোধ করে রাখায় প্রায় এক মাস দেরি হয় দূর্গ অবরোধে,ফলে সুলেইমান ভিয়েনায় অভিযান না চালিয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হন।
এরপর থেকেই ইব্রাহীম একের পর এক ভুল করা শুরু করেন।
ইরাক অভিযানের সময় বাগদাদ দখল না করে তিনি তাবরিজ জয় করে নেন,যা ভৌগোলিক কারনে ধরে রাখা ছিল অসম্ভব।সেনাবাহিনী নিয়ে শত্রুর এলাকার একেবারে মাঝখানে ঢুকে পড়ায় সুলেইমান ইব্রাহীমের ওপর ক্ষুদ্ধ হন।সৈন্যরাও তাদের সহ্যশক্তির সীমায় চলে গিয়েছিল,যা সুলেইমানকে হতাশ করে।
এর দায় আসলে ইব্রাহীমের ছিল না।
ইব্রাহীমকে ষড়যন্ত্র করে তাবরিজের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন দাফতারদার বা ফাইন্যান্স সেক্রেটারী ইস্কান্দার চেলেবি,যাতে সুলতানের কাছে তার নামে অভিযোগ করা যায়।
ক্ষুদ্ধ ইব্রাহীম ইস্কান্দারকে ফাসিতে ঝোলান।
ইস্কান্দার কোন যা তা লোক ছিলেন না।
অটোমান সাম্রাজ্যের সবচাইতে ধনী কয়েকজন ব্যক্তির একজন ছিলেন তিনি।তার দাসের সংখ্যাই ছিল প্রায় সাত হাজার।অন্যান্য পাশাদের ভেতর তার ছিল ব্যাপক প্রভাব।
কিন্তু ইব্রাহীমের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পেরে তিনি তার সাথে দ্বন্দে লিপ্ত হন।
ইস্কান্দার নিজের মৃত্যুর সময় সুলতানকে বলেন যে তিনি নির্দোষ।
এই ঘটনা সুলেইমানকে প্রচন্ড প্রভাবিত করে।প্রথমবারের মত তিনি ইব্রাহীমকে অবিশ্বাস করতে শুরু করেন।
মানুষের উচ্চাভিলাষের কোন শেষ নেই।এক ক্রীতদাস থেকে উজির হবার পরেও ইব্রাহীমের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেড়েই চলতে থাকে।
ইরাক অভিযানের সময় ইব্রাহীম নিজের নামে সেরাসকার সুলতান পদবী ব্যবহার করে সুলেইমানকে প্রচন্ড ক্ষুদ্ধ করে তোলেন।
এর সাথে যোগ হয় খুররাম সুলতানের ষড়যন্ত্র।
তিনি ইব্রাহীম আর সুলতানের বন্ধুত্বে ঈর্ষান্বিত ছিলেন।সুলতানের ওপর তিনি ছাড়া আর কেউ প্রভাব ফেলুক তা তিনি সহ্য করতে পারতেন না।একইভাবে ইব্রাহীম খুররামের উচ্চাভিলাষী স্বভাব সম্পর্কে জানতেন,তাই তাকেও তিনি সহ্য করতে পারতেন না।দুজনের মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধ চলতো আরো একটা বিষয় নিয়ে,শাহজাদা মুস্তাফা।
সুলেইমানের বড় ছেলে,অত্যন্ত মেধাবী মুস্তাফার সিংহাসনে বসার সম্ভাবনা ছিল বেশি,যা খুররাম নিজের সন্তানদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখতেন।মুস্তাফার এক নম্বর সমর্থক ছিলেন ইব্রাহীম,এবং ইব্রাহীম সুলতানের এতই প্রিয় ছিলেন,তিনি একাই সুলতানের মত বদলানোর জন্য যথেষ্ট ছিলেন।
ইব্রাহীমের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের তালিকাতে আরও ছিলেন লুতফি পাশা,সেমিজ আলী পাশা আর আয়াজ মেহমেদ পাশারা।
কুটনীতিক হিসেবেও অসম্ভব মেধাবী ছিলেন ইব্রাহীম।
তার দক্ষতার কারনে তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে ভেনিসের সাথে কোন যুদ্ধ হয় নি,সেই সাথে চার্লসকে আশ্বস্ত করে প্রায় অবিশ্বাস্যভাবে যুদ্ধ ছাড়াই হাঙ্গেরীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দূর্গের দখল পেয়ে গেছিল অটোমানরা।একারনে ভেনিশিয়ানরা তাকে ইব্রাহীম দ্যা ম্যাগনিফিসেন্ট ডাকা শুরু করে।
সুলতান সুলেইমান ইউরোপের আন্তুর্জাতিক রাজনীতিতে অটোমানদের আধিপত্য স্থাপনের যে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেম,তা সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য ইব্রাহীমের কূটনীতি ছিল অত্যন্ত কার্যকরী।
ফ্রান্সের সম্রাট ফ্রান্সিসের মা সুলেইমানকে ছেলে ডেকেছিলেন,সেই সুত্রে সুলেইমান ফ্রান্সিসকে ভাই ডাকতেন।
ফ্রান্সিস সুলেইমানের সবচাইতে কাছের মানুষ কে তা জানতেন,তাই ইব্রাহীমের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন তিনি।
ইব্রাহীম আর ফ্রান্সিস মিলে ১৫৩৬ সালে গড়ে তোলেন বিখ্যাত ফ্রেঞ্চ-অটোমান অ্যালায়েন্স।
ধারনা করা হয়,আমেরিকা অভিযানের পরিকল্পনাও ছিল ইব্রাহীম পাশার।
কিন্তু এত সাফল্যের ভেতরে তিনি আসলে দূরে সরে যাচ্ছিলেন সুলেইমানের কাছ থেকে।বিশেষভাবে খুররাম সুকৌশলে সুলেইমানকে তার ওপর ক্রুদ্ধ করে তুলছিলেন।
ইব্রাহীমের নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে সুলতান নিজেও বারবার প্রমান পাচ্ছিলেন।
ইস্কান্দার চেলেবির মৃত্যুর কথাও তিনি ভুলতে পারছিলেন না।
এক পর্যায়ে সুলেইমান অনুভব করতে পারলেন,ইব্রাহীম আসলে নিজেকে সুলতানের প্রতিদ্বন্দী ভাবা শুরু করেছেন।ফ্রান্সের দুতদের সাথে ইব্রাহীমের কথোপকথনে তা প্রকাশও পায়।

sajal

লেখক

সুলতান তার একমাত্র বন্ধুকে কখনো হারাতে চান নি।কিন্তু তার জায়গা থেকে দেখলে,তার হয়তো আর উপায়ও ছিল না।
শাইখুল ইসলামের কাছে গিয়ে সুলতান জানতে চাইলেন,আমি একজনকে কখনো হত্যা না করার ওয়াদা করেছি,কিন্তু যদি আমাকে তার গর্দান নিতেই হয়,সেক্ষেত্রে আমি কি করতে পারি??
শাইখুল ইসলাম বললেন,যদি কোনভাবেই তা থামানো না যায় তো আপনি কাফফারা দিতে পারেন।
এরপর থেকে সুলতান পর পর সাত দিন ইব্রাহীমকে প্রাসাদে তার সাথে খেতে ডাকলেন।তিনি প্রচন্ড মানসিক যন্ত্রনায় ভুগছিলেন।
ইবরাহীমকে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল যে তাকে হত্যা করা হতে পারে।সুলেইমান চাচ্ছিলেন তিনি পালিয়ে যান।
ইবরাহীম পালালেন না।
সুলেইমান তাকে টানা সাতদিন একদম একাকী দাওয়াত করেছিলেন,তিনি আসলে চাইছিলেন,তিনি বন্ধুর জীবন নেয়ার আগে বন্ধুই তার জীবন নিয়ে নিক।
কিন্তু ইব্রাহীম কিছুই করলেন না।
সাতদিনের দিন,রাতের খাবারের পর ইব্রাহীমকে ঘিরে ধরে একদল সিলাহদার,সুলতানের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর দল।
গলায় রেশমের কাপড় পেচিয়ে প্রাচীন তুর্কো-মোঙল পদ্ধতিতে শ্বাসরোধ করে ইব্রাহীমকে হত্যা করা হয়।
তাকে কোন চিহ্ন ছাড়াই দাফন করা হয় অজ্ঞাত স্থানে।
এই ঘটনা সুলেইমানের জীবনে গভীর এক দাগ কাটে।
জীবনে আর কোনদিন তিনি কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেন নি।
ইব্রাহীমের মৃতুর পর সুলতান খুব প্রয়োজন না হলে মানুষের সামনে আসা বন্ধ করে দেন।
অনেক বছর তিনি কোন অনুষ্ঠানে বিশেষ ধুমধাম করা থেকে বিরত থাকেন।
তার চরিত্র হয়ে ওঠে আগের চাইতে নিষ্ঠুর।
বাল্যবন্ধু,একমাত্র সহচর ইব্রাহীমকে হারানোর শোক সুলতান কোনদিনই কাটিয়ে উঠতে পারেন নি।এই ঘটনার বিশ বছর পরেও সুলতান তা বিভিন্ন কবিতায় ইব্রাহীমের জন্য আফসোস করেছেন।
কে জানে,ওপারে হয়তো ইব্রাহীম তার বন্ধুকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
হয়তো তাদের আত্মারা এখনো খেলতে আসে তোপকাপি প্রাসাদের বাগানে।
একদম সেই কৈশোরের দিনগুলির মত।

লেখকঃ শিক্ষার্থী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়