বুধবার, ফেব্রুয়ারী ২২, ২০১৭
UCC-LOGO1

ঢাবিতে মেট্রোরেল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের যুক্তিখণ্ডন

12507599_1655022321418590_264461231492418665_nআমাকে যারা চিনেন, সবার মাঝেই আমি কট্টর আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত। কখনো ভাবি নাই যে মুজিবকন্যার একটা বক্তব্য নিয়ে এভাবে পয়েন্ট বাই পয়েন্ট অ্যানালাইসিস করতে হবে। সে যাই হোক, উনার আজকের এই বক্তব্য আমাকে হতাশ করেছে।

.

মুনতাসির ওয়াহেদঃ 
“মেট্রোরেলের অ্যালাইনমেন্ট তো আজকের না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র ও কর্মচারীদের কথা চিন্তা করেই এই অ্যালাইনমেন্টটা দিলাম যে, সেখানে একটা স্টেশন হবে; ওই উত্তরা থেকে মাত্র ১০ মিনিটে চলে আসবে। অর্থাৎ দ্রুত চলে আসতে পারবে। ” – এই যে আপনি বলে দিলেন, শিক্ষক-ছাত্রদের কথা চিন্তা করে এই অ্যালাইনমেন্ট দিয়েছেন। আমি তো দেখতে পাচ্ছি ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী এটা চাচ্ছে না!

*** “এই অ্যালাইনমেন্ট এক দিনের না। সেখানে সয়েল টেস্ট হয়ে গেছে। অ্যালাইনমেন্ট হয়ে গেছে। কত বছর লাগল এটা আমাদের করতে। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কিন্তু কথাও হয়েছে। আলোচনা না করে করা হয়েছে, তা কিন্তু না। হঠাৎ দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র-শিক্ষক আন্দোলনে নেমে গেল। তাদের নাকি পরিবেশ নষ্ট হবে।” – আপনি কথা বলেছেন কর্তৃপক্ষের সাথে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু কর্তৃপক্ষের না শুধু, এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর। তাদের কথা একবার শোনার কি প্রয়োজন মনে হয় নি আপনার?
.
*** “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে তো রেললাইনই আছে।” – যে রেললাইনের কথা বলছেন, সেটা ক্লাসরুমের পাশ দিয়ে চলে যায়নি। সেখান থেকে নেমে আরো ২০-৩০ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে যেতে হয়! আর এই রেল করা হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য, কারণ ক্যাম্পাসটি চট্টগ্রাম শহর থেকে অনেক দূরে।12515982_1759820557563858_1069066320_n (1)
.
*** “লাইব্রেরিতে নাকি পড়াশোনা হবে না। আমরা তো ডিজিটাল লাইব্রেরি করে দিচ্ছি—সাউন্ড প্রুফ। কোনো অসুবিধা হবে না।” – প্রথমত এই লাইব্রেরী আপনারা করে দেননি। ফ্যাকাল্টি অফ বিজনেস সাইন্স রবির সহযোগিতায় এটি করেছে।
.
আর দ্বিতীয়ত, লাইব্রেরীটি শুধু ব্যাবসা অনুষদের শিক্ষার্থীদের জন্য। আর সেই অনুষদের উপর কোনো ইফেক্ট মেট্রোরেল এমনেও ফেলছে না।
.
মেট্রোরেল সরাসরিভাবে প্রভাব ফেলবে জেনেটিক প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল ইত্যাদি বিভাগের উপর। অন্যগুলোর কথা জানি না। ডিজিটাল লাইব্রেরী তো দূরের কথা, আমি নিজের ডিপার্টমেন্টের লাইব্রেরীতে গিয়ে গিলবার্ট স্ট্র্যাং-এর লিনিয়ার এলজেবরা বইটি পাইনি। লাইব্রেরী কার্ড করা নাই বলে সেন্ট্রাল কিংবা সাইন্স লাইব্রেরী থেকেও নিতে পারিনি।
.
Untitledমেট্রোরেল তো আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন। যেখানে বসতি আছে, সেখানে সাউন্ড সিস্টেম কন্ট্রোল করার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। সেটা সম্পর্কে তাদের জ্ঞান নাই। সেই খবরটাও তারা রাখেনি।” – আপনি তাত্ত্বিকভাবে চিন্তা করছেন। বাস্তবে সব এভাবে হয় না! উদাহারণস্বরূপ, ছয় বছরে মগবাজার ফ্লাইওভারের কাজ অর্ধেক শেষ করা সম্ভব হয় নি। আগামী ছয় বছরেও হবে কি না সন্দেহ। আপনারা ভিআইপি মানুষ, মগবাজার এলাকা দিয়ে হয়তো কখনোই যাওয়া হয় নি। একবার এ জায়গা থেকে ঘুরে আসতে পারেন। মানুষ কী পরিমাণ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে এখানে, তার একটা চিত্র আপনাদেরও দেখা উচিত।
.
ঠিক একই অবস্থা যে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেও হবে না, তার নিশ্চয়তা দিচ্ছেন কোথা থেকে? ছয় বছরে ফ্লাইওভার করা যাচ্ছে না, সেখানে চার বছরে মেট্রোরেল! আপনাদের তো সয়েল টেস্ট করতেই চার বছর লেগে গেল!
.
*** “যে ছাত্র-ছাত্রীরা বলছেন লেখাপড়া করতে পারবেন না; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তো এত ছোট জায়গা না। এটা যেখান দিয়ে যাচ্ছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান-বাংলা একাডেমি হয়ে চলে যাবে। এখানে পড়াশোনার ক্ষতিটা কী করে হবে।” – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এত ছোট জায়গা না? নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেকাট্রনিক্সের মত দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ডিপার্টমেন্ট এখনো স্থায়ী ক্লাসরুম পাইনি, এ খবর কি আপনি রাখেন?
.
12509304_1759643350914912_1166945453169332951_n আমাদের সিএসই ডিপার্টমেন্টের একটা ফ্লোরের কাজ আটকে আছে টাকার অভাবে? আমরা ক্লাস করি দুইটা ফ্লোর নিয়ে, জেনেটিক প্রকৌশল করে এক ফ্লোর নিয়ে – সে খবর রাখেন? যেখানে সিএসই কিংবা জিইবি ডিপার্টমেন্টের একারই একটা ভবন পাওয়া উচিত!
.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩৪০ একর জায়গা যে সরকার বিভিন্ন সময়ে অধিগ্রহণ করেছে, সেগুলোর ক্ষতিপূরণ কোথায়?
.
*** “পড়ার ইচ্ছা থাকলে ওই ট্রেনে চলতে চলতেও মানুষ পড়ে। বাসে বসে পড়ে, গাড়িতে বসে পড়ে। পড়ে না? তারা যেখানে বসবাস করে তার আশপাশে দিনরাত যে কনস্ট্রাকশনের কাজ হচ্ছে। তখন পড়ছে না বাড়িতে বসে। কই তারা গিয়ে ওই বাড়ির কনস্ট্রাকশনের কাজ বন্ধ করতে পারছে? তা তো বন্ধ করছে না।” – বিদ্যাসাগর ল্যাম্পপোস্টের আলোয় কিংবা ফজলুল হক (সম্ভবত) ওয়াশরুমে বসে পড়ালেখা করতেন – সেগুলোও বলতে পারতেন! বাড়িতে বসে পড়ালেখা আর একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো এক না! শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ হতে হয় serene এবং tranquil। তাছাড়া আপনি একটু আগে বলছিলেন এটাতে শব্দ হবে না। এখন শিকার করে নিলেন যে শব্দ হবে। ধন্যবাদ।
.
*** “তিনি বলেন, হানিফ ফ্লাইওভার আরও বড় করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি বাধা দিল। তো এ রকম যদি উন্নয়ন কাজে বাধা দেওয়া হয়। তো উন্নয়ন হবে কোথা থেকে।” – বুয়েট যে কাজটা করেছে, সেটা আমরাও করবো। একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এসবের জায়গা না। আপনি মেয়র হানিফের উদাহারণ যেহেতু টানলেন একবার চানখারপুল এলাকায় এসে দেখে যাবেন অনুগ্রহ করে, সেখানে ফ্লাইওভারের নিচের অবস্থা কী।  অবশ্য আপনারা ভিআইপি মানুষ। সাধারণ জনগণের ভোগান্তি দেখতে আপনাদের বয়েই গেল!
.
12524022_10208321917027828_7982597987095152296_n*** “যদি আওয়াজে এতই সমস্যা হয়, তাহলে কানের মধ্যে প্লাগ লাগিয়ে নেবে, তাতে অসুবিধা নাই। কারণ এমনিতেই তো আইপ্যাডে গান শোনে।” – আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, আপনি এ কথা বলেছেন! যদি এটা সত্যি হয়ে থাকে, আজ আমার মন থেকে শ্রদ্ধা করা মানুষদের লিস্ট থেকে আরও একটি নাম হারিয়ে গেল।
.
*** “উন্নয়নের কাজে দয়া করে কেউ বাধা দেবেন না। কার কী অসুবিধা আমরা বুঝি, সে ব্যবস্থা আমরা নেব। আধুনিক প্রযুক্তি, সাউন্ড প্রুফ করা যাবে। এটা কোনো সমস্যা না। এইগুলি করতে গেলে পুরো প্রজেক্ট নষ্ট হবে এবং সাধারণ মানুষ ভুক্তভোগী হবে। যারা ইউনিভার্সিটি পড়বেন তাঁরা তো দু-চার বছর পড়ে চলে যাবেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের যে কষ্টটা, সেটা তো থেকে যাবে। সেই কষ্ট বা ভোগান্তিটা মানুষকে কেন দেবেন?” – আমাদের ক্যাম্পাস আমাদের সেকেন্ড হোম। এখানে আমরা চার বছরের জন্য আসি না। এটাকে আমরা আমাদের জীবনের অংশ মনে করি। এ ক্যাম্পাসের কোনো ক্ষতি আমরা মেনে নিবো না। আর যেহেতু আপনি জনগণের ভোগান্তি নিয়ে অনেক চিন্তিত, আপনাকে একটা উপদেশ আমি দিতে পারি। আপনাদের যাওয়া-আসার জন্য যখন দুই-তিন ঘন্টা পথ আটকে দেওয়া হয়, তখন জনগণের অনেক ভোগান্তি হয়। আপনি অনুগ্রহ করে আপনার কার্যালয়ের পাশ দিয়েও একটি স্টেশন রাখবেন। ঢাকাবাসীর ভোগান্তি অর্ধেক কমে যাবে।
.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মচারীদের প্রতি আপনার পিতার কী পরিমাণ ভালবাসা ছিল – তার কিছু উদাহারণ দিয়ে আমি এ লেখাটি শেষ করবো। (তাড়াহুড়ো করে লেখা। নিজে লেখার সময় পাইনি। একটা পোর্টাল থেকে নিচের ঘটনাগুলো কপি করে নিলাম।)
.
(১) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারীদের এসব দাবির প্রতি বঙ্গবন্ধুসহ বহু ছাত্রনেতা সর্মথন জানান। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অচল হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সমর্থনকারী ছাত্রদের শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মুসলিম সরকারের ইঙ্গিতে বঙ্গবন্ধুসহ ২৭ ছাত্রকে এজন্য বহিষ্কার ও জরিমানা করা হয়।

(২) ১৯৭২ সালের শেষের দিকে ছাত্ররা অটোপ্রমোশনের জন্য শিক্ষকদের ঘেরাও করে রাখলে শিক্ষকদের উদ্ধারের জন্য তিনি আসেন। পরে আলোচনা করে এ সমস্যার সমাধান করা হয়।
.
(৩) সে বছর আরেকবার ডাইনিংয়ে রুটির পরিবর্তে ভাতের দাবিতে ছাত্ররা উপাচার্যকে তার বাংলো বাড়িতে ঘেরাও করলে উপাচার্য12523091_515632311953662_3591766755423622941_nকে উদ্ধারের জন্য বঙ্গবন্ধু প্রটোকল ছাড়া শুধু গেঞ্জি গায়ে চলে আসেন এবং ছাত্রদের রুটির পরিবর্তে ভাত দেওয়ার আশ্বাস দেন। ফলে ছাত্ররা ঘেরাও তুলে নেয়।
.
(৪) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন একটি হল (স্যার এএফ রহমান হল) নির্মাণের জন্য তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল মতিন চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর কাছে অনুরোধ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের জন্য তখন বিপুল অর্থের প্রয়োজন। এত টানাটানির মধ্যেও বঙ্গবন্ধু নতুন এই হল নির্মাণে বরাদ্দ দেন। ফলে স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন একটি ছাত্রাবাস নির্মিত হয়। মূলত বঙ্গবন্ধুর কারণেই তা সম্ভব হয়।
.
(৫) ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে আমন্ত্রণ জানান। বঙ্গবন্ধু তখন রাষ্ট্রপতি এবং পদাধিকার বলে চ্যান্সেলর। বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের খবরে সর্বত্র সাজ সাজ রব পড়ে যায়। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে। শিক্ষকগণ সেদিন বঙ্গবন্ধুর হাতে ফুল দিয়ে বাকশালে যোগ দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। ছাত্র-শিক্ষকগণ বঙ্গবন্ধুকে সামনে থেকে দেখা এবং তার বক্তৃতা শোনার জন্য দিনক্ষণ গুনছিল। কিন্তু ওই দিন খুব সকালে একদল বিপথগামী সৈন্য বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করে।
.
শেষ পয়েন্টটি লেখার একটি বিশেষ কারণ আছে। পুরো দেশ যখন বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছিল, সে সময়ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধুকে ভালবেসেছিল। আপনাকেও আমরা ভালবেসেছি ঠিক এতটাই। অনুগ্রহ করে আমাদের ভালবাসার মূল্য রাখবেন।


লেখকঃ শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রথম বর্ষ  


 

এমএল