ইডেন ছাত্রলীগ নেত্রীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়


Dhaka
Published: 2019-11-12 23:02:26 BdST | Updated: 2019-12-14 03:29:01 BdST

নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সম্প্রতি পদচ্যুত হয়েছেন ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। সংগঠনের শীর্ষ দু’নেতার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার মধ্যদিয়ে সতর্ক করা হয়েছে সংগঠনটির প্রতিটি স্তরের নেতাকর্মীদের। তবে সেই সতর্কতা আমলে নিচ্ছে না সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। দলীয় কোন্দল, ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার, সিট বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের সাথে এখনো জড়িত রয়েছেন সংগঠনটির বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত রাজধানীর ইডেন সরকারি মহিলা কলেজের আবাসিক হলে সিট বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এরপরেই সামনে চলে আসে প্রতিষ্ঠানটির ছাত্রলীগ নেত্রীদের সিট বাণিজ্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইডেন কলেজের আবাসিক হলের সংখ্যা ৬টি। প্রতিটি হলেই রয়েছে ছাত্রলীগ নেত্রীদের বেশ কয়েকটি করে রাজনৈতিক কক্ষ। সেই কক্ষগুলো নেত্রীদের দখলে। ওই সব রাজনৈতিক কক্ষে ওঠা কিংবা নামা পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেন প্রতিষ্ঠানটির ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেত্রী। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রলীগ নেত্রীদের নিয়ন্ত্রণাধীন রুমগুলোতে একজন শিক্ষার্থীকে উঠতে মোটা অঙ্কের অর্থ দিতে হয়। ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটির একটা বড় অংশ এই সিট বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। ছাত্রলীগ নেত্রীদের মাধ্যমে হলে উঠতে একজন শিক্ষার্থীকে ১৫ থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত অর্থ গুনতে হয়। তবে বহিরাগত শিক্ষার্থীদেরকে অর্থের বিনিময়ে হলে রাখার অভিযোগ রয়েছে বেশ কয়েকজন নেত্রীর বিরুদ্ধে।

২০১৬ সালের ১ নভেম্বর ইডেন মহিলা কলেজ শাখার আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেয় তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক এম এম জাকির হোসাইন। এতে তাসলিমা আক্তারকে আহ্বায়ক করা হয়। এছাড়া শাহনাজ আক্তার, নিশাত সাদিয়া খান মিলি, নাসিমা আক্তার, আঞ্জুমানারা অনু, মুনমুন নাহার বৈশাখী, তামান্না জেছমিন রিভা, পাপিয়া রায়, তানজিলা আক্তার আইরিন, জান্নাত আরা জান্নাত, বিথী আক্তার, পাপিয়া আক্তার প্রিয়া, ইফরাত জাহান ইতি, মাহবুবা নাসরিন রূপা, বিপাসা খাতুন রনি, জেরিন তাসনিম পূর্নিকে যুগ্ম-আহ্বায়ক হিসেবে মনোনীত করা হয়।

এছাড়া আরো ৪৩ জনকে সদস্য হিসেবে পদায়ন করা হয়। সর্বশেষ চলতি বছরের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ইডেন ছাত্রলীগের সর্বোশেষ সম্মেলন। তবে প্রতিষ্ঠানটিতে এখনো কমিটি দিতে পারেনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। বেশিরভাগ সদ্য বিদায়ী যুগ্ম-আহ্বায়ক আসন্ন কলেজ ছাত্রলীগের কমিটিতে শীর্ষ পদ পেতে জোর লবিং-তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রতিষ্ঠানটির সিট বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গত শনিবার দুপক্ষের সংঘর্ষ বাধে। সেখানে এক নেত্রীর সামনেই তার অনুসারীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ দেন আরেক নেত্রীর অনুসারী। ঘটনার শুরু হয় একজন বহিরাগত শিক্ষার্থীকে হলে রাখাকে কেন্দ্র করে। কয়েকজন শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুবা নাসরিন রূপা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হলের ২১৯ নং কক্ষে নাবিলা নামের একজন বহিরাগত শিক্ষার্থীকে টাকার বিনিময়ে রাখতেন। তাকে রাখাকে কেন্দ্র করে হলে অন্য নেত্রীদের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়।

এ সময় রূপার এক অনুসারী ছাত্রলীগ কর্মী সাবিকুন্নাহার তামান্নার হাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ দেন। ওই ঘটনার একদিন পর সোমবার সকালে ইডেন কলেজে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে সুস্মিতা বাড়ৈ নামে আরেক ছাত্রলীগকর্মী হামলার শিকার হন। কলেজ শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক রিভা, বিথি, জারিন পূর্ণি, ইতি, পাপিয়া রায়, পাপিয়া পিয়া, জান্নাত আরা জান্নাত তাকে মারধর করে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইডেন কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ইডেন কলেজের সদ্য বিদায়ী আহ্বায়কসহ প্রত্যেক যুগ্ম আহ্বায়ক সিট বাণিজ্যের সাথে জড়িত। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তারা সিট বাণিজ্য পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্যাম্পাসে যিনি যত বেশি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন তিনি ততটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন বলে ছাত্রলীগ নেত্রীদের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। ফলে কক্ষ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইডেন কলেজের রাজনৈতিক কক্ষগুলোর একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন সদ্য বিদায়ী কমিটির আহ্বায়ক তাসলিমা আক্তার। কয়েক বছর আগেই তার ছাত্রত্বের মেয়াদ শেষ হয়েছে, তবে এখনো তিনি হল ছাড়েননি। পুরো ক্যাম্পাসে তার নিয়ন্ত্রণাধীন কক্ষের সংখ্যা ১৫টার অধিক। অভিযোগ রয়েছে তিনি অর্থের বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের হলে ওঠান। এ বিষয়ে কথা বলতে তাসলিমা আক্তারকে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। একটি সূত্র জানিয়েছে তিনি দেশের বাহিরে অবস্থান করছেন।

সিট বাণিজ্য, প্রশ্ন ফাঁসসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত যুগ্ম আহ্বায়ক আঞ্জুমানারা অনু। তিনি গণিত বিভাগের ২০০৮-০৯ সেশনের শিক্ষার্থী। ২০১৬ সালে তার ছাত্রত্ব শেষ হয়। তারপরেও কলেজ ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটিতে তিনি পদ পান। অভিযোগ রয়েছে তিনি ইডেন কলেজের রাজিয়া বেগম হলের দুইটি কক্ষ নিয়ে তিনি বসবাস করছেন। এছাড়া খোদেজা খাতুন ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হলে তিনি বেশ কয়েকটি কক্ষ নিয়ন্ত্রণ করছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অনু বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আসছে এগুলো উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আমি কখনো কোনো ধরনের সিট বাণিজ্যের সাথে জড়িত ছিলাম না। একাধিকবার কেনো ঘুরে ফিরে কতিপয় নেত্রীদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ ওঠে এমন প্রশ্নের জবাবে অনু বলেন, একটি চক্র ইচ্ছাকৃতভাবে এ ধরনের প্রচার-প্রচারণা বা গুজব ছড়াচ্ছে। রাজনীতি বিষয়টা এমনই।

সিট বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের সাথে দুর্ব্যবহার, জোর পূর্বক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেয়া, মাদক সেবনসহ বহু অভিযোগে অভিযুক্ত কলেজ ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক বিপাসা খাতুন রনি। তবে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। সিট বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, আমি কোন সিট বাণিজ্য করি না। ছাত্রলীগের ক্যান্ডিডেট হওয়ার পর একটি মহল আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করেছে। এর সাথে আমি কখনোই জড়িত ছিলাম না।

সিট বাণিজ্য, ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার, প্রতিপক্ষের উপর হামলাসহ বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে সদ্য বিদায়ী কমিটির আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুবা নাসরিন রুপার বিরুদ্ধে। তিনি বহিরাগত শিক্ষার্থীদের অর্থের বিনিময়ে হলে রাখেন বলে সর্বশেষ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন ইডেন ছাত্রলীগের একটি অংশ। তবে তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করে দোষ চাপিয়েছেন প্রতিপক্ষের উপর।

তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হিসেবে যাকে জড়িয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে সেই মেয়েটি আমাদের কলেজের ডিগ্রির ছাত্রী। আমরা যারা রাজনীতি করি তারা কর্মী সমর্থক নিয়ে রুমে থাকি। এখানে বহিরাগতের থাকার কোন সুযোগ নেই। বিষয়টি বানোয়াট এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত।

প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীদের উপর প্রভাব বিস্তার, কক্ষ দখলসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেত্রী তামান্না জেছমিন রিভা। অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। একই অভিযোগে অভিযুক্ত আরেক নেত্রী জারিন তাসনিম পূর্ণি। তিনিও ফোন ধরেননি। একই অভিযোগে অভিযুক্ত পাপিয়া রায়। ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তার, ও অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোসহ নানা অপরাধের সাথে জড়িত তিনি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে তাকে ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করনেনি।

ইডেন কলেজের আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক জান্নাত আরা জান্নাত। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০১৬ সালের মার্চের পর প্রয়োজনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হওয়া জান্নাত এখন কোটি টাকার মালিক। বাবা তাড়াশ সদর ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। এক চাচা বাবলু তাড়াশ কলেজ ছাত্রদলের নির্বাচিত নেতা ছিলেন। এখন যুবদলের রাজনীতির সাথে জড়িত। আপন ছোটভাই সাফী ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত। এখন ছাত্রলীগের সাথে ওঠাবসা করে। ভগ্নিপতি ফরহাদ স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক। বক্তব্য জানতে তাকে ফোন দেয়া হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। সিট বাণিজ্য, কর্মীদের উপর নির্যাতন, ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তারসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেত্রী মুনমুন নাহার বৈশাখী। তিনি যুবলীগ থেকে সম্প্রতি বহিষ্কৃত এক প্রভাবশালী নেতার বান্ধবী। ওই পরিচয় ব্যবহার করে তিনি নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। সেই যুবলীগ নেতা আটকের পর থেকে তিনি পালাতক রয়েছেন।

সিট বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগ নেত্রী নাসিমা আক্তার এবং ইফরাত জাহান ইতির বিরুদ্ধে। তারা কেউ এর সাথে জড়িত নয় বলে জানান। অভিযোগের বিষয়ে নাসিমা আক্তার বলেন, ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের বর্তমান কোন কমিটি নেই। সুতরাং এখানে ছাত্রলীগের নাম আসার কোন প্রশ্নই ওঠে না। একই সুরে কথা বলেন ইফরাত জাহান ইতি। তিনি বলেন, ইডেন কলেজে কোন সিট বাণিজ্য নেই। প্রশাসনের কাছে এ বিষয়ে খোঁজ নিতে পারেন।

ছাত্রলীগ নেত্রীদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইডেন কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. শামসুন নাহারের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, ইডেন কলেজে বর্তমানে ছাত্রলীগের কমিটি নেই। এই ইউনিটটির নেতাকর্মীদের নিজেদের মাঝে কিছু সমস্যা হয়েছে। ওখানে কার্যক্রম যাতে গতিশীল হয়, কোন ধরণের ঝামেলা যাতে আর না হয় বা যে সমস্ত নেগেটিভ বিষয়গুলো আমরা শুনি সেগুলো যাতে না হয় এজন্য আমরা কেন্দ্র থেকে একটা তদন্ত টিম পাঠিয়েছি। তদন্ত শেষে রিপোর্ট হাতে আসলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।