রবিবার, মার্চ ২৬, ২০১৭
UCC-LOGO1

বাংলাদেশে মাশরুম গবেষণার মাইলফলক রাবি শিক্ষক আহমেদ ইমতিয়াজ

teacher-mashrum

রাশেদুল ইসলাম রাজন: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আহমেদ ইমতিয়াজ বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট মাশরুম গবেষক এবং মাশরুম গবেষনায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি মাশরুম গবেষণার সুবাদে কোরিয়া জাপান ইউএসএ সহ এ পর্যন্ত প্রায় পনেরোটি দেশে ঘুরেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিএস-সি (সম্মান) এবং এমএস-সি শেষ করে ২০০৫-১২ পর্যন্ত কোরিয়া এবং জাপানে পি-এইচডি এবং পোস্টডক্টরাল পর্যায়ে মাশরুম নিয়ে সফলভাবে গবেষণা করেন। বর্তমানে মাশরুম গবেষণা তার পেশা তো বটেই, নেশাও পরিণত হয়েছে।

মাশরুমের পরিচয় সম্পর্কে তিনি বলেন, উদ্ভিদ বিজ্ঞানের অনেক শাখা-প্রশাখা আছে। কোনো কোনো উদ্ভিদের পাতা ফুল ফল হয়। কোনো কোনো উদ্ভিদে এ সব হয় না। কিছু উদ্ভিদ আকারে বড় আর কিছু ছোট কিংবা অতি ছোট। পাতাহীন কান্ডহীন ফুলহীন ছত্রাক জাতীয় উদ্ভিদের একটি ফলদেহ হলো মাশরুম যা পুষ্টিময় বলবর্ধক খাদ্য এবং ওষুধ হিসেবে মহামুল্যবান।

teacher-mashrum-1-(1)মাশরুমের গুরুত্ব জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমান পৃথিবীতে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শুধুমাত্র শর্করা সমৃদ্ধ খাদ্যের সরবরাহই যথার্থ নয়। বরং এমন একটি সুষম আদর্শ খাদ্য চাই যা সত্যিকারেই প্রয়োজনীয় পুষ্টির উৎস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে খাদ্য বস্তুতে শর্করার পাশাপাশি থাকতে হবে অন্য সব উপাদান। মাশরুমই হতে পারে সেই কাঙ্খিত আদর্শ খাদ্যবস্তু। কারণ, মাশরুমে আছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় শর্করা, আমিষ, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ এবং ফাইবার সহ নানাবিধ অপরিহার্য খাদ্য ও ঔষধী উপাদান যা আমাদের দেহের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী ও সুসহনীয়।

উল্লেখ্য যে, মাশরুমের পুষ্টিমান সবজি এবং মাংসের মাঝামাঝি। তাইতো মাশরুমকে সবজি আমিষ তথা গরীবের মাংস বলা হয়। মাছ মাংস ডিম খেলে পর্যাপ্ত আমিষ পাওয়া যায় বটে কিন্তু অতি প্রয়োজনীয় উপাদান ভিটামিন ও ফাইবার মোটেও পাওয়া যায় না। অথচ প্রাণিজ আমিষের সাথে প্রবেশ করে শরীরে বাসা বাঁধে অতি ক্ষতিকর চর্বি যা হার্টের প্রধান শত্রু। সাধারণ সবজি মাছ মাংস ও ডিমের ঠিক বিপরীত অর্থাৎ শর্করা ও আমিষের চাহিদা মিটাতে ব্যর্থ। সুতরাং মাশরুমই একমাত্র আদর্শ খাবার যা মানব শরীরের জন্য প্রয়োজন সব মৌলিক খাদ্য উপাদান সুসহনীয় মাত্রায় সরবরাহ করে। নিয়মিত মাশরুম খেলে শরীরের অতিরিক্ত চর্বি ভেঙ্গে মেদভুড়ি দূর করে এবং দীর্ঘ দিন যাবত শরীরের মধ্যে বাসাঁেবধে থাকা অনেক জটিল ও কঠিন রোগ নিরাময়েও দারুন কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশে মাশরুম ভিত্তিক কৃষি ও শিল্প কারখানা গড়ে উঠার সম্ভাবনা তথা আর্থসামাজিক অবস্থা কতটা উপযোগী এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বাংলাদেশের এ্যাগ্রোক্লাইমেট এবং এই অঞ্চলের মানুষের জীবন যাপনের ধরণ মাশরুম কৃষির জন্য খুব খুবই উপযোগী। এই কৃষির জন্য ফসলি জমির দরকার হয় না বরং শোবার ঘরের মতো ছোট ছোট ঘরেই র‌্যাকে মাশরুম চাষ করা যায়। কাজটি হালকা এবং নিজ বাড়িতে হওয়ায় নারী পুরুষ, স্কুলগামী ছেলেমেয়ে এবং বৃদ্ধরাও এই কৃষিতে অংশ নিতে পারে।

সুতরাং পরিবারের সবাই তাদের স্ব স্ব কাজের পাশাপাশি মাশরুম চাষে অবদান রাখতে সক্ষম। বাংলাদেশে মহিলারা সাধারণত বাড়ির অভ্যন্তরে কাজ করতে অভ্যস্থ। তাদের জীবনযাত্রা বিবেচনা করলে বলা যায় যে মাশরুম চাষ মহিলাদের জন্য খুবই উপযোগী। কৃষি কাজে ক্রমবর্ধমান রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার পরিবেশকে ক্রমেই হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আশারবাণী হচ্ছে মাশরুম চাষ করতে কোনো রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার হয়না। তাই এই কৃষি শতভাগ পরিবেশ বান্ধব। অন্যান্য ফসল চাষের তুলনায় মাশরুম আবাদের মাধ্যমে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে কৃষকের হাতে অর্থ ফিরে আসে। মাশরুম চাষে ব্যবহৃত সাবস্ট্রেট পরিত্যাক্ত হলে তা অন্যান্য কৃষি কাজে সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সাবস্ট্রেট উদ্ভিজ্জ পদার্থ হওয়ায় এবং রাসায়নিক উপাদান না থাকায় আদর্শ জৈব সার বিবেচনা করা যেতে পারে। ম্যালনিউট্রিশন বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য ক্রয় করা দরিদ্র মানুষের পক্ষে মোটেও সম্ভব হয়না। ঘরে ঘরে মাশরুম চাষ এ সমস্যার সমাধান করতে পারে সহজেই।

বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম জনগোষ্টির দেশ হওয়ায় বেকারত্ব এখানকার বড় সমস্যা। শহর ও গ্রাম-গঞ্জের ঘরে ঘরে মাশরুম কৃষি বিকল্প ও নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরী করে বেকারত্ব মোচনে অবদান রাখতে পারে। ফলে এই কৃষি আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করে দারিদ্রতা দূর করণে যথার্থ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করি। দেশে মাশরুম চাষীদের বেশ কতক গুলো সমস্যা থাকলেও দুটি সমস্যাই প্রধান বলে মনে করেন তিনি।teacher-mashrum-1-(2)

এক. বীজের (স্পন) অভাব। প্রশিক্ষণের জন্য অল্প পরিমাণ বীজ তৈরী হলেও একজন চাষীকে মাশরুম চাষের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠার জন্য নূন্যতম যে পরিমাণ বীজ দরকার তার পাঁচ শতাংশ বর্তমানে উৎপাদন হয় না। দুই. উৎপাদিত মাশরুম বিক্রির স্থান বা ক্রেতা নেই। ফলে আগ্রহী কৃষক প্রশিক্ষণ নিয়ে অতি কষ্টে বীজ সংগ্রহ করে মাশরুম চাষ করে। কিন্তু সহজে বিক্রি করতে না পারায় কিংবা যথার্থ মূল্য না পাওয়ায় হতাশ হয়ে চাষ বন্ধ করে দেয়।

বাংলাদেশে মাশরুমের গবেষণা ভিত্তিক কৃষি ও শিল্প কারখানা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার গবেষণা, চিন্তা ও মনন জুড়ে যেহেতু মাশরুম তাই এটা নিয়ে আমার স্বপ্ন ও পরিকল্পনাও অনেক। তাই টলমলে স্বপ্ন নিয়ে ‘মাশটেক’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানে মাশরুম গবেষণার কার্যক্রম প্রাথমিকভাবে শুরু করা হয়েছে। মাশরুম চাষীরা যেন নিরাশ না হয় সেই জন্য সারা দেশের মাশরুম চাষীদের নিকট থেকে মাশরুম ক্রয় করে ‘মাশটেক’ এর মাধ্যমে মাশরুম সমৃদ্ধ খাদ্য পণ্য তৈরী/প্রসেস করে পরীক্ষামূলক বাজার জাত করা হচ্ছে।

এছাড়া ড. ইমতিয়াজ ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মাশরুম ও মাশটেক প্রোডাক্ট’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বেশ কয়েকটি খাদ্য পণ্য ফর্মূলেট করা হয়েছে বলে জানান তিনি। যেমন উচ্চ-রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়বেটিস রোগীদের জন্য মাশরুমের আটা, মাশরুম-কুমড়া বড়ি মাশরুমের আচার, ফার্মা গ্রেড প্রোডাক্ট, মাশরুমের চা/কফি, মাশরুম দিয়ে তৈরী হরলিক্স জাতীয় প্রোডাক্ট ইত্যাদি পন্য তৈরী করে তিনি স্বল্প মাত্রায় বাজারেজাত করছেন।

মাশরুমের এই উপকারিতা বা গুরুত্ব সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান ‘মাশইনফো’ এর মাধ্যমে বেকার যুবক ও আগ্রহী চাষীদের খুব কম খরচে মাশরুম চাষের উপর প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন তিনি। এছাড়া জনসচেতনার জন্য এ বিষয়ে পত্রিকায় কয়েকটা আর্টিকেল লিখেছেন। এমনকি তিনি ‘মাশরুম বায়োলজি’ নামে বাংলায় একটি বই লিখেছেন যা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সিলেবাসের অংশ হিসেবে পড়া হয়। তবে মাশরুম ভিত্তিক শিল্প কারখানা গড়ে তোলার জন্য সরকারী/বেসরকারী বড় কোনো উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান ইনিশিয়েটিভ নিলে সতস্ফুর্তভাবেই যথাযথ সহযোগিতা করার আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

তবে বাংলাদেশে মাশরুম গবেষণা হতশাজনক কথা শুনিয়ে বলেন, বর্তমানে বিশ্বব্যাপি অতি শুরুত্ব সহকারে মাশরুমের চাষ ও গবেষণা হলেও বাংলাদেশ হতাশাজনকভাবে পিছিয়ে। বেসরকারী উদ্যোগে যা হয় সেটা একেবারেই সীমিত। আর সরকারী উদ্যোগ বলতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে যা ঢাকার অদূরে সাভারে অবস্থিত। সরকারী আর দশটা প্রতিষ্ঠানের মতো এই প্রতিষ্ঠানও আমলা তান্ত্রিক জটিলতা এবং বদলি রোগে জর্জরিত।

অনভিজ্ঞরা এসে কিঞ্চিত অভিজ্ঞ হতে না হতেই বদলি। ফলে সেই শ্বেত হস্তি! সুতরাং অদূর ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটিকে মানসম্মত গবেষণার সক্ষমতা অর্জন করতে হলে সত্যিকারের অভিজ্ঞ মাশরুম গবেষকদের যথার্থ মর্যাদা দিয়ে গবেষণার সাথে তাঁদেরকে কীভাবে যুক্ত করা যায় তার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। অন্যথায়, আপন জাতের কানা ভালো ফর্মুলায় চললে দলকানাদের নিয়ে কানামাছিই খেলা হবে, গবেষণা হবে না।

এমআর/ ২০ আগস্ট ২০১৬