22651

আফগানিস্তানের ইতিহাস (পর্ব-০১)

আফগানিস্তানের ইতিহাস (পর্ব-০১)

2021-08-30 12:57:49

পৃথিবীর প্রতিটি সভ্যতার সাথে বর্তমান আফগানিস্তান রাষ্ট্রের সম্পর্ক ছিল। পারস্য থেকে শুরু করে আলেকজান্ডারের বিজয়ের ঝান্ডাসহ মধ্যযুগের ব্রিটিশ বেনিয়াদের থাবার কবলে ছিল আফগানিস্তান।

১৮৩৯-১৮৪২ সালে অ্যাংলো -আফগান (প্রথম) যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধের মাধ্যমে আফগানিস্তানে ইউরোপীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৩৯ সালে ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়েন আফগানিস্তানের বারাকজাই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং আমীর দোস্ত মুহাম্মদ খান।আমীর দোস্ত মুহাম্মদ (১৮২৬-১৮৩৯) ১ম দফা এবং (১৮৪২ -১৮৬২) ২য় দফায় আমীরের দায়িত্ব পালন করেন।তাঁর মৃত্যুর পর আমীরের দায়িত্ব পালন করেন আমির শের আলি খান।তিনি ১৮৬৩-১৮৭৯ পর্যন্ত আমীরের দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর শাসনকালে আফগানিস্তানকে ব্রিটিশ ও রুশদের প্রভাব থেকে নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত তিনি ব্যর্থতার শিকার হয়েছেন।যার ফলাফল হিসাবে ১৮৭৮ সালে ২য় অ্যাংলো -আফগান যুদ্ধ শুরু হয়। এর ফলে আমীর রাশিয়াতে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন।১৮৭৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মুহাম্মদ ইয়াকুব খান শাসনভার লাভ করেন।সময় তার আপন গতিতে এগিয়ে চলে।

ইতিহাসের পাতায় নতুন বরপুত্রের নাম লিখিত হয়।কেউ হয় স্মরণীয় বা নিন্দনীয়। সময়ের পরিক্রমায় আফগানিস্তানের রাজনীতির মঞ্চে আর্বিভাব ঘটে আমীর আমানউল্লাহ খানের। আমানউল্লাহ খান ছিলেন হাবিবুল্লাহ খানের তৃতীয় পুত্র। আততায়ীর হাতে হাবিবুল্লাহ খানের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হোন আমানউল্লাহ খান।

এরই মধ্যে ১৯১৭ সালে সংঘটিত হয় রুশ বিপ্লব। যাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ ও রুশদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। তাই এই সময়ে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আমীর আমানউল্লাহ সুযোগ কাজে লাগান।১৯১৯ সালের ৩ মে আফগানিস্তান ব্রিটিশ ভারতের উপর হামলা চালায় শুরু হয় ৩য় অ্যাংলো -আফগান যুদ্ধ।

এরই মধ্যে আমানউল্লাহ খান অটোমান শাসকদের নিকট থেকে সাহায্য পেতে থাকেন। অন্যদিকে ব্রিটিশরা ১ম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে ১৯১৯ সালের শেষ দিকে এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। আফগানিস্তান থেকে ব্রিটিশ প্রভাব সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়।প্রথম দিকে আমানউল্লাহ খান জনপ্রিয় ছিলেন।

তিনি এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে কিছু সংস্কার হাতে নিয়েছিলেন। দেশকে আধুনিক করতে চেয়েছেন।

ছেলে-মেয়েদের জন্য স্কুল খোলা, শতাব্দীপ্রাচীন নারীদের পোশাকের নিয়ম শিথিল করা হয়েছিল।পাশাপাশি আমানউল্লাহ খান ইউরোপ সফর শুরু করেন।

কিন্তু আমানউল্লাহ খানের এই সংস্কারের পদক্ষেপ সাধারণ আফগানদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়নি।অন্যদিকে হাবিবুল্লাহ কালাকানি প্রচারণা চালিয়ে যেতে থাকেন।

তিনি আমানউল্লাহ বিরুদ্ধে নাস্তিকতার অভিযোগ করতে থাকে। গ্রামীণ মৌলভিদের উস্কে দিয়ে তাঁর স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেন।এই ক্ষেত্রে তিনি সফল।
হাবিবুল্লাহ কালাকানি অনেকের নিকট "বাচে সাকাও" বা "পানি বহনকারী পুত্র" হিসাবে পরিচিত। তাঁর অনেক অনুসারি তাকে "রবিনহুডের" সাথে তুলনা করলেও তাঁর বিরোধীরা তাকে "ডাকাত" বলে সম্বোধন করতো। আফগানিস্তানের সেই সময়ের অস্থির রাজনীতি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর "দেশে-বিদেশে" ভ্রমণ কাহিনীতে বিবরণ রয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলের "শিনওয়ারি গোত্রীয়রা" আমানউল্লাহ খানের বিরুদ্ধে চলে যায়। যা সফলভাবে কাজে লাগায় বাচে সাকাও।তাই আমানউল্লাহ খানকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে হয়।
কিন্তু রাজনীতির শেষ বলে কিছু নেই।বাচে সাকাও ক্ষমতা দখল করার পর আমানউল্লাহ খানের সকল পদক্ষেপ রদ করেন।কিন্তু ক্ষমতায় তিনি ছিলেন মাত্র নয় মাস।

বাচে সাকাও এর পতন ঘটে নাদির শাহের হাতে।উল্লেখ্য নাদির শাহ ছিল আমানউল্লাহ খানের সেনাবাহিনীর প্রধান (জেনারেল)।নাদির শাহ বাচে সাকাওকে হত্যা করে ক্ষমতায় বসেন।

তিনি ক্ষমতায় এসে আমানউল্লাহ খানের অধিকাংশ সংস্কার রদ করেন। সেনাবাহিনীর পুনর্গঠনের কার্যক্রম চালু রাখেন। তারপরও সেনাবাহিনী ছিল দুর্বল।

তাঁর সময়ে ১৯৩১ আফগানিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন করেন। আধুনিক কার্যক্রম চালু রাখেন। তবে তা আমানউল্লাহ খানের চেয়ে কম।তিনি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হন।কাবুলে প্রথম কাবুল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন।

তিনি আমানউল্লাহ খানের কূটনীতিক সম্পর্ককে বাণিজ্যিক সম্পর্কে রূপান্তর করেন।দেশের উন্নয়নের জন্য মধ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন।কিন্তু আব্দুল খালিক নামক এক ব্যাক্তির হাতে তাকে প্রাণ হারাতে হয়।নাদির শাহের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন তাঁর ছেলে মুহাম্মদ জহির শাহ। তিনি ইতিহাসে আফগানিস্তানের শেষ বাদশাহ।
১৯৩৩ থেকে ১৯৭৩ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত বাদশাহ ছিলেন।

ইতালিতে চিকিৎসার জন্য ভ্রমণে গিয়ে তিনি তাঁর প্রধানমন্ত্রী এবং বোনের স্বামী মুহম্মদ দাউদ খান দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত হন।২০০২ সালে তিনি আফগানিস্তানে ফিরে এসে জাতির পিতা উপাধিতে ভূষিত হোন।তাকে আফগানিস্তানের প্রসিডেন্ট হওয়ার জন্য লয়া জিরগা অনুমোদন দিলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে তিনি সরে আসেন।
পরে হামিদ কারজাই প্রেসিডেন্ট হোন।জহির শাহের শাসনকালে ১৯৬৫ সালে আফগানিস্তানের people's Democratic party of Afghanistan (PDPA) প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দল মাক্সবাদ এবং লেলিনবাদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল।
PDPA এর প্রতিষ্ঠাতা পুরুষগণ হচ্ছে নূর মোহাম্মদ তারিকি, হাফিজুল্লাহ আমিনি,বাবরাক কারমল ও ডা. নাজিবুল্লাহর খান।জহির শাহ আফগানিস্তানের আধুনিকায়নের চেষ্টা করেন। তিনি আফগানিস্তানে প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন। রাজনৈতিক দলের বিকাশ ঘটান।রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকার পরও তিনি ১৯৬৪ সালে নতুন আফগানিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন করেন। এতে আফগানিস্তানকে আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়ার কথা বলা হয়েছে।অন্যদিকে জহির শাহ প্রথম পূর্ব তুর্কিস্তান প্রজাতন্ত্র গঠনে উইগুর এবং কিরগিজ মুসলিমদের সহায়তা করে যা পরে চিনের হুইদের নিয়ে গঠিত ৩৬ ডিভিশনের নিকট পরাজিত হয়। ১৯৭৩ সালে অভ্যুত্থানের শিকার হলেও তিনি গৃহযুদ্ধ এড়াতে নির্বাসনে চলে যান।১৯৭৩ সালে অভ্যুত্থানের পর আফগানিস্তানের মসনদে বসেন মুহাম্মদ দাউদ খান। তিনি ১৯৭৬ সালে পাকিস্তানের সাথে প্রক্সি যুদ্ধের কারণে তৎকালীন পাক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোর বিরাগভাজন হয়েছিলেন। ফলে বাণিজ্যিক সম্পর্কের অবনতি হয়।এই সময়ে আফগানিস্তানের ইসলামি আন্দোলনের নেতারা পাকিস্তানে আশ্রয় নেয় তখন পাকিস্তান তাদেরকে দাউদ খানের বিরুদ্ধে সমর্থন দেন। অন্যদিকে ১৯৭৮ সালে পিডিপিএ এর সাথে দাউদ খানের সম্পর্ক ফাটল ধরে। এতে মস্কো অসন্তুষ্ট হয়। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ধারণা করে আফগানিস্তান পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে। সেই সময় দাউদ খান মিশর,সৌদি আরব, ভারত,ইরান সফর করেন।
১৯৭৭ সালে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। তখন পিডিপিএ এর খালক এবং পারচাম গ্রুপের বিরোধ মিটাতে চেষ্টা করেন। তখন লিওনিদ ব্রেজনেভ আফগানিস্তানকে এশিয়ার জোট নিরপেক্ষতার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মনে করেন এবং নেটো বাহিনীর বিশেষজ্ঞদের আফগানিস্তানে উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।এর জবাবে দাউদ খান বলেন আফগানিস্তান স্বাধীন দেশ হিসাবে থাকবে এবং কীভাবে চলবে এর জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের পরামর্শ দিতে হবে না।যার মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে তাঁর সম্পর্ক ফাটল ধরে। সোভিয়েত ইউনিয়নের নির্ভরতা কমাতে তখন তেল সমৃদ্ধ সৌদি আরব, ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করেন।মিশরের সাথে আফগানিস্তানের সামারিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং আফগান সামরিক বাহিনী ও পুলিশ বাহিনিকে মিশরিয়রা প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। যা সোভিয়েতে ইউনিয়নকে ক্ষুব্ধ করে।যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালে সাওর বিপ্লব সংঘটিত হয়।এতে ক্ষমতাচ্যুত হন দাউদ খান এবং উনিসহ উনার পরিবারের অনেকে নিহত হন।এবার ক্ষমতায় আসে মাক্সবাদী ওলেলিনবাদী পিডিপিএ এর নূর মুহাম্মদ তারিকি।যিনি পিডিপিএ এর খালক পন্থি গ্রুপের।
ক্ষমতায় এসে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করেন।দেশের মধ্যে ভূমি সংস্কারসহ অন্যান্য সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেন।আফগানিস্তানের জনগণের ইসলামি সংস্কৃতির সঙ্গে বিপরীত অনেক সংস্কৃতি চালু করেন।যা জনগণের মধ্যেপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এগুলো অজনপ্রিয় হয়।শিক্ষা ক্ষেত্রে পরিবর্তন চেয়েছিলেন।যা পিডিপিএ এর দলীয় কর্মীদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন।
১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর ৫ তারিখ তারিকি সোভিয়েত -আফগান ২০ বছর মেয়াদি মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করেন।এর মাধ্যমে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সেনা পাঠনোর পটভূমি তৈরিহয়।সময়ের সাথে সাথে তারিকির সাথে আমিনির সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
তারিকি খালক এবং পারচাম গ্রুপের নেতাদের বন্দী,হত্যা এবং বিদেশে প্রেরণ করেন।
এরই মধ্যে হাফিজুল্লাহ আমিনি অভ্যুত্থান করে তারিকিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
আমিনির নির্দেশে তারিকিকে হত্যা করা হয়।এতে সোভিয়েত ইউনিয়ন নাখোশ হয়।
সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন হাফিজুল্লাহ আমিনিকে সরাতে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তানে প্রেরণ করে।সোভিয়েত ইউনিয়নের ধারণা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিগ্রিধারী হাফিজুল্লাহ আমিনি মার্কিনীদের এজেন্ট। তাই সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তানে প্রবেশ করে আমিনিকে হত্যা করে বাবরাক কারমলকে ক্ষমতায় বসায়।
(চলবে)
আফগানিস্তানের ইতিহাস (পর্ব-০২)

বাবরাক কারমালের ক্ষমতা গ্রহণের পর গণপ্রজাতন্ত্রী আফগানিস্তানের জন্য মৌলিক নীতি গ্রহণ, নূর মোহাম্মদ তারিকি ও আমিনের শাসনামলে কারাগারে নিক্ষিপ্ত ব্যাক্তিদের ন্যায়বিচারের নায্য বিষয়গুলো প্রাধান্য দেয়।কিন্তু পরিতাপের বিষয় আফগান জনগণের নিকট তাঁর উদ্যোগগুলো গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
যার ফলাফল হিসাবে নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আসে বিশাল ব্যর্থতা। তাই সোভিয়েত নেতৃত্ব কারমালের দেশ পরিচালনাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে।মিখাইল গর্বাচেভের নেতৃত্বে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ কারমালের পরিবর্তে মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহকে আফগান মসনদে স্থলাভিষিক্ত করে।

নাজিবুল্লাহর শাসনঃ

নাজিবুল্লাহ ক্ষমতা লাভের পর পিডিপিএ দল ও রাষ্ট্রের নতুন রূপ প্রদান করার চেষ্টা করে।মুসলিমদের সমর্থন লাভের জন্য ১৯৮৭ সালে নজিবউল্লাহ তাঁর নামের সাথে পুনরায় উল্লাহ যোগ করেন। কমিউনিস্ট প্রতীকসমূহ অপসারণ বা প্রতিস্থাপন করা হয়। তবে ইসলামের প্রশ্নে মুজাহিদদের প্রতি জনসমর্থন বেশি থাকায় সরকারের প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি পায়নি।১৯৮৭ সালে সংবিধানের ২নং অনুচ্ছেদ ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম হিসাবে ঘোষণা করা হয়।১৯৮৮ সালের ১৪ এপ্রিল আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সরকারের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং এতে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জামিন হিসাবে স্বাক্ষর করে।এই চুক্তি অনুসারে সোভিয়েত সেনা ১৯৮৯ সালের ১৫ ই ফেব্রুয়ারীর মধ্যে আফগানিস্তান ত্যাগ করতে হবে।সোভিয়েতদের ফিরে যাওয়ার পর খাবার,জ্বালানি অস্ত্রের সরবরাহ চালু থাকে।১৯৯০ সালে সোভিয়েত সহায়তার মূল্য ছিল ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।আফগান সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণরূপে সোভিয়েত সাহায্যের উপর নির্ভরশীল ছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর নজিবুল্লাহ সাবেক সোভিয়েত মধ্য এশিয়ার দিকে নজর দেন। এই অঞ্চলের নবগঠিত রাষ্ট্রসমূহ আফগানিস্তানকে তেল এবং গম দিয়ে সাহায্য করে। সোভিয়েত বাহিনীর অপসারণের পর আফগান সরকার এবং মোজাহিদদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। তখন নাজিবুল্লাহ রাশিয়ার সাহায্য চায় কিন্তু রাশিয়া তাতে সাড়া দেয়নি।অন্যদিকে নাজিবুল্লাহ ১৯৮৯ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে আংশিক ভাবে আফগান সেনাবাহিনী গড়ে তুলেন। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১ লক্ষ মিলিশিয়া ছিল। সার্বিক ভাবে সরকারের নিকট ৩লক্ষ সেনা ছিল।কিন্তু তখন সরকারি বাহিনী রক্ষণাত্মক ভূমিকায় চলে যায়। সরকারের নিকট মাত্র ১০%ভূমির নিয়ন্ত্রন ছিল।"খোস্ত অবরোধের" মাধ্যমে মোজাহিদদের সাথে চলমান ১১ বছরের যুদ্ধের অবসান হয়।নাজিবুল্লাহ সরকারের প্রতি রুশ সমর্থন ও সাহায্য বন্ধ হয়ে যায়। তখন নাজিবুল্লাহ জাতিসংঘের অন্তর্বর্ন্তীকালীন পরিষদের নিকট ক্ষমতা হস্থান্তর করে।
তিনি জাতিসংঘের সচিবালয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। নাজিবুল্লাহ দেশ ত্যাগ করতে চাইলে তাতে বাঁধা দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে যখন তালেবান ক্ষমতায় আসে তখন নাজিবুল্লাহকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়।

মোজাহিদ বাহিনীর উত্থানঃ

১৯৭৯ সালে তারিকি আফগানিস্তানের দ্রুত আধুনিকায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।তিনি ভূমি সংস্কার, নারী -পুরুষের সমতা ঘোষণা, রাজনৈতিক জীবনে নারীর অংশগ্রহণ, নারী শিক্ষা ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।তাঁর এই সকল পদক্ষেপ রক্ষণশীল আফগান সমাজে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সাধারণ আফগান এইগুলোকে ইসলাম বিরোধী হিসাবে মূল্যায়ন করে। অন্যদিকে ভূমি সংস্কারের জন্য গ্রামের জোতদার শ্রেণী ক্ষিপ্ত হয়।
উল্লেখ্য এই ভূমি সংস্কার করার জন্যই বাদশাহ আমানুল্লাহ খানকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়।
তারিকির বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমের বিরোধিতা করে দেশব্যাপী ব্যাপক সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠে। প্রতিরোধকারীরা নিজেদের মোজাহিদ হিসাবে পরিচয় দেয়।তাঁরা তারিকি সরকারকে নাস্তিক ঘোষণা করে তাঁর বিরুদ্ধে জেহাদের ডাক দেয়।
সেই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার আফগানিস্তানে সোভিয়েত প্রভাব বিস্তার নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।তিনি প্রকাশ্যে মোজাহিদের সমর্থন দেন।
পাকিস্তানের আইএসআইয়ের মাধ্যমে মোজাহিদ বাহিনীর জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয়।মোজাহিদ বাহিনীর আক্রমণের ফলে তারিকি কোণঠাসা হয়ে পরে, তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য চান। ফলে ২০ বছর মেয়াদি আফগান -সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু আমিনি কর্তৃক তারিকির মৃত্যুর পর
সোভিয়েত কারমলের হাতে ক্ষমতা দেয়।অন্যদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লব আর মোজাহিদ বাহিনীর আক্রমণের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানের মসনদ রক্ষার জন্য সেনা প্রেরণ করেন। যা মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক পরিসরে আলোড়ন সৃষ্টি।
৩৪টি মুসলিম দেশ OICএর মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনা প্রত্যাহার করার জন্য অনুরোধ করে।অন্যদিকে মোজাহিদ কোনো একক বাহিনী ছিল না।মত, পথ এবং নেতৃত্বের কোন্দালে তারা কমপক্ষে ৮০টি দল বা উপগ্রুপে বিভক্ত ছিল।
এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল জামায়াতি ইসলামি এবং গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার অংশের হেজবে ইসলামি।মোজাহিদ বাহিনীর মাঝে সবচেয়ে কট্টর ছিল হেজবে ইসলাম। ISI,পাকিস্তান জামাত, এবং সৌদি আরবের আর্শীবাদ ছিল তাদের উপর।
১৯৯২ সালে নাজিবুল্লাহ সরকারের পতনের পর জামিয়াত ক্ষমতায় আসেন।
তখন এর প্রধান ছিল বোরহান উদ্দিন রাব্বানী। রাব্বানী রাষ্ট্রের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ইসলামিক স্টেট অফ পাকিস্তান।
জমিয়াত ক্ষমতা দখলের পর তাদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য হেজবে ইসলামি এবং অন্যান মুজাহিদ বাহিনীর সাথে সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়।
কাবুলের বেশিরভাগ এলাকা ধবংসস্তুপে পরিণত হয়। লক্ষাধিক আফগান নিহত হয়। কাবুলে ৫০ হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হয়।ঠিক সেই মোল্লা ওমর ৫০ জন অনুসারী নিয়ে প্রথম কান্দাহারে তা লে বা ন বাহিনী গঠন করে।
মিস্টার ওমর মার্কিন সহায়তায় পাকিস্তানে নির্মিত মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন।
উল্লেখ আফগান -পাকিস্তান সীমান্তে প্রায় ২০০০ মাদ্রাসা গড়ে উঠে। যার সিলেবাস প্রণয়ন করে নেব্রাস্ক বিশ্ববিদ্যালয়।
তা লে বা ন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানি জামায়েত হেজবে ইসলামি থেকে সমর্থন তুলে নিয়ে তা লে বা ন কে সমর্থন দেওয়া শুরু করে।
পাকিস্তান, সৌদি আরব থেকে প্রাপ্ত অর্থ,অস্ত্রের জোরে দ্রুত তা লে বা নরা শক্তিশালী বাহিনী হিসাবে গড়ে উঠে।এদের হাতে ১৯৯৬ সালে রাব্বানী সরকারের পতন ঘটে।
তখন আফগানিস্তানের নাম রাখেন ইসলামিক এমিরাত অব আফগানিস্তান।

নর্দার্ন অ্যালায়েন্সঃ১

৯৯৬ সালে কাবুল পতনের পর হেজবে ইসলামের বড় অংশ তা লে বা নের সাথে যোগ দেয়।জামিয়াত এবং সমমনা আরো কিছু মুজাহিদ আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের ১৫% অঞ্চল রক্ষা করতে পেরেছিল।তাঁরা রাব্বানীকে রাষ্ট্রপতি করে বিকল্প সরকার গড়ে তুলেন। যা নর্দার্ন অ্যালায়েন্স নামে পরিচিত।ইরান, রাশিয়া,তুরস্ক, ভারত,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নর্দার্ন অ্যালায়েন্সকে সমর্থন করে।অপরদিকে পাকিস্তান তা লে বা ন কে সমর্থন দেয়।

১৯৯৬ সালের তা লে বা নি শাসনঃ
তা লে বা ন ক্ষমতা দখল করে জাতিসংঘের সচিবালয়ে আশ্রয় গ্রহণকারী ডা নাজিবুল্লাহকে হত্যা করে। টেলিভিশন নিষিদ্ধ করা হয়, সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যায়।গান ও ছবি তোলা নিষিদ্ধ হয়ে যায়।রেডিওসহ নারীদের সকল চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়।

নারীদের জন্য চোখ ঢাকা বোরখা বাধ্যতামূলক করা হয়।প্রাথমিক শিক্ষার বাহিরে অন্য শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়। চাকরি বা ঘরের বাহিরে কাজ করার সুযোগ না থাকায় অনেক বিধবা নারী ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করে।
৯/১১ হামলাঃ
৯/১১ এর হামলার পর উসামা বিন লাদেন কে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে না দেওয়ায় তার মিত্র ন্যাটো বাহিনীসহ আফগানিস্তান আক্রমণ করে তা লে বা ন কে উৎখাত করে।
মার্কিনিরা তাদের পুরানো মিত্র মোজাহিদ বা নর্দার্ন অ্যালায়েন্সকে ক্ষমতায় বসায়।
দেশের নাম " Islamic State of Afganistan করা হয়।

বিগত ২০ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। পাশাপাশি আফগান ইসলামিক স্টেট এর পাহাড়াদার হিসাবে কাজ করেছে।এই সময়ে ২৫০০ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা নিহত হয় এবং মার্কিন বাহিনীর হাতে নিহত হয় ৩ লক্ষ আফগানি।এখন আফগানিস্তানের ৭০ %নারী নিরক্ষর। ৮০% নারী সহিংসতার শিকার।
তৃতীয় বিশ্বের জন্য যে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার' রক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো উচ্চকণ্ঠ তুলে তার কোনোটাই প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি আফগানিস্তানে।

মাঝখানে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে কিছু মার্কিন নাগরিক যারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেছে।কারণ যুদ্ধ তাদের জন্য আর্শীবাদ। এতে অস্ত্রের বাজার চাঙ্গা হয়।
কিন্তু এই যুদ্ধের অভিশাপে ধ্বংস হয়েছে সভ্যতা, ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

প্রাণ দিয়েছে ৩ লক্ষ নিরীহ আফগান উপজাতিয় মানুষ।ইতিহাস চলে তার আপন গতিতে। ২০ বছরের ব্যবধানে আফগান মসনদে স্থলাভিষিক্ত আবারও তা লে বা ন।

১৫ আগস্ট আশরাফ ঘানি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। বিনা বুলেটে কাবুল দখল করে তা লে বা ন।রাশিয়া, চীন এবং পাকিস্তান সমর্থন দেয় তা লে বা নকে।
অন্যদিকে ভারত,তুরস্ক, ন্যাটো জোট স্পষ্ট করেছে, তাঁরা আশরাফ ঘানি বা সাবেক মোজাহিদ মিত্রদের পাশে থেকে তাঁরা তাদের বজায় রাখতে চেষ্টা করবে।
সময় নির্ধারণ করবে আফগান মসনদে কার স্থায়ী আসন হবে।

ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আফগানিস্তান বর্তমানে মধ্য এশিয়ার সাবেক ৫টি সোভিয়েত অঞ্চলের প্রবেশ পথ, যা রুশ সরকারের জন্য মহাগুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭৯ সালে ১৫ হাজার সোভিয়েত সেনার বলি হয়েছিল এই আফগানিস্তানের মাটিতে।
তাই যেকোনো মূল্যে মধ্য এশিয়াতে রাজনৈতিক ইসলামের জোয়ার রুখতে হবে।
( ETIM) ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্টকে তা লে বা ন থেকে দূরে রাখতে হবে।
অন্যদিকে তা লে বা নে র সেই ইচ্ছে নেই পশতুন
জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনের মোড়কে সুন্নি ইসলামের রাজনীতি রফতানি করা।পাশাপাশি আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে আফগানিস্তানের সাথে চীনের ৮০ কিঃমিঃ সীমান্ত রয়েছে।
তাই চীনের উইগুরের স্থিতিশীলতার জন্য শান্তিপূর্ণ আফগানিস্তান দরকার।
অন্যদিকে পাকিস্তানের দরকার অনুগত আফগান মসনদ,

আর ইরানের প্রয়োজন বন্ধুপ্রতিম শাসক গোষ্ঠী যারা সংখ্যালঘু আফগান শিয়া (হাজারাদের) প্রতি হবে সহনশীল। তাই এই সকল হিসাবে ইরান, পাকিস্তান, চীন এবং রাশিয়া এক অক্ষে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিষ্ময় কাতার তা লে বা নে র জন্য রাজনৈতিক অফিস চালু করে অদৃশ্য প্রভাব বজায় রাখবে আফগান মসনদে।

অন্য দিকে রণ ক্লান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো জোট, ভারত এবং তুরস্ক পরিস্থিতি বিবেচনা করছে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ এখন এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে। তাই আফগানিস্তানে আপাতত তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ নেই। আর আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ২০ বছর ধরে যে সুশীল সমাজের বিকাশ ঘটেছে তাঁর মাধ্যমে তা হাসিল হবে।যা চেকোস্লাভিয়াতে করেছিল।ভারতের রয়েছে বিশাল বিনিয়োগ। যার নিরাপত্তা দরকার।
তাই ভারত চেষ্টা করবে একটি স্থিতিশীল আফগানিস্তান যেখানে থাকবে নারী অধিকারএবং ভিন্ন মতের প্রতি সহনশীল এক সরকার। আফগানিস্তান হচ্ছে পরাশক্তিদের স্বার্থের চাবি।নিজেদের জন্য যুদ্ধ শুরু করে কিন্তু বিপন্ন হয় সাধারণ মানুষ।অর্থাৎআফগানিস্তান হচ্ছে পরাশক্তিদের গোরস্থান। যা চক্রাকারে ঘুরে।
(শেষ)

মোঃমেহেদী হাসান
৩৬তম বিসিএস(সাধারণ শিক্ষা)
প্রভাষক,রসায়ন বিভাগ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ।

 

 

সম্পাদক: ইসমাঈল হোসাইন রাসেল
যোগাযোগ: ক্যাম্পাস টাইমস
৪৩ শহীদ নজরুল ইসলাম সড়ক, হাটখোলা রোড, চৌধুরী মল, টিকাটুলি, ঢাকা-১২০৩
মোবাইল: ০১৬২৫ ১৫৬৪৫৫
ইমেইল:[email protected]