শিক্ষার্থীদের ডেকে এনে ৫ ঘণ্টায়ও হলে তুলতে পারেনি প্রশাসন


RU Correspondent | Published: 2022-07-01 22:40:33 BdST | Updated: 2022-08-14 21:56:12 BdST

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে অবৈধভাবে থাকা অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের আসন থেকে নামিয়ে সেখানে বৈধ শিক্ষার্থীদের তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে হল প্রশাসন। এ জন্য শুক্রবার (১ জুলাই) বিকাল ৪টা দিকে হলটিতে অভিযান চালানোর কথা জানান প্রাধ্যক্ষ। তবে রাত ৮টা পর্যন্ত কাউকে হলে তুলতে পারেনি প্রশাসন। বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে হল প্রাধ্যক্ষের কক্ষে শুরু হওয়া মিটিং এখনও চলছে।

এদিকে, পাঁচ ঘণ্টায়ও হলে উঠতে না পারায় হল ফটকে অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, হল প্রশাসন বিকাল ৪টায় তাদেরকে সিটে তুলে দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিল। এ জন্য তারা মেস ছেড়ে আসবাবপত্র নিয়ে এসেছেন। কিন্তু পাঁচ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তাদেরকে সিটে তোলা হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, আমাকে বিকাল ৪টায় সিটে তুলে দেওয়া হবে জানিয়েছিল। কিন্তু এখন ৮টা বাজে তাও সিটে তুলে দেওয়ার কোনও খবর নেই। রাতে কোথায় থাকবো জানি না।

তিনি আরও বলেন, আমার মতো অনেকে মেস ছেড়ে দিয়ে এসেছেন। এখন রাতে কোথায় থাকবে কেউ জানে না। তাই আমরা আসবাবপত্র নিয়ে হল গেটে অবস্থান নিয়েছি।

হল সূত্র ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে ৯৪টি আসন খালি হয়। এরপর হল প্রশাসন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আবেদনপত্র আহ্বান করে ভাইভা নিয়ে অ্যাকাডেমিক ফলাফল ও অন্যান্য বিবেচনায় ৬৬ শিক্ষার্থীকে হলে আসন বরাদ্দ দেয়। তবে এই ৬৬ জনের মধ্যে মাত্র ২২ জনকে তাদের আসনে তুলতে পেরেছে প্রশাসন। এখন পর্যন্ত ৯৪টি আসনের বিপরীতে ৭২টি দখল হয়ে আছে। বৈধভাবে যাদের আসন দেওয়া হয়েছে, তারাও অনাবাসিক দখলদারদের দ্বারা হুমকি পাচ্ছেন। এমনকি হল থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ জুন হল শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের প্রাধ্যক্ষের স্বাক্ষর করা একটি নোটিসের মাধ্যমে হলে অবস্থান করা অনাবাসিক, বহিরাগত ও অন্য হলের শিক্ষার্থীদের ২৯ জুনের মধ্যে হল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। কোনও শিক্ষার্থী তার সমস্যার বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে হল প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে ২৮ জুনের মধ্যে অভিভাবকসহ হল প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। তবে শর্ত অনুযায়ী কেউ দেখা করেননি। এমনকি অনাবাসিক কোনও শিক্ষার্থী এখন পর্যন্ত নামেননি। ওই নোটিসে আবাসিক শিক্ষার্থীদের হলে উঠতে বাধা দেওয়া হলে তাৎক্ষণিক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল।

এখানে উল্লেখ্য যে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

বিছানাপত্র নিয়ে হলের বারান্দায় শিক্ষার্থীরা

এদিকে আবাসিকতা পেয়েও দীর্ঘদিন হলে উঠতে না পারা শিক্ষার্থীরা তাদের বিছানাপত্র নিয়ে হলের বারান্দায় অবস্থান করছেন। বিকাল ৩টা থেকে হল ফটকে অবস্থান নেন। তারা বলছেন, হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদেরকে আজ সিটে তুলে দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেয়।

নাম প্রকাশ করা না শর্তে এক শিক্ষার্থী বলেন, অনেক দিন হলো আবাসিকতা পেয়েছি। তবে সিটে উঠতে পারছিলাম না। প্রাধ্যক্ষ স্যার আমাদের বলেছেন, আজ তিনি সিটে তুলে দেবেন। তাই বিছানাপত্র নিয়ে চলে এসেছি।

অনড় অবস্থানে ছাত্রলীগের

সোহরাওয়ার্দী হল ছাত্রলীগের সভাপতি নিয়াজ মোর্শেদ দাবি করেন, বর্তমান প্রভোস্ট স্যার (অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম) সাবেক ছাত্রদল নেতা। তিনি এই হলে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিরুদ্ধাচরণ করছেন। তিনি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হলের আবাসিকতা দেন না। অন্য শিক্ষার্থীদের আবাসিকতা দিয়ে দিয়েছেন। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের এক কর্মীর জন্য আমি সুপারিশ করেছিলাম। কিন্তু প্রভোস্ট স্যার বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের কর্মী শুনে তাকে আবাসিকতা দেননি।

তিনি আরও দাবি করেন, বর্তমান প্রভোস্ট স্যার হলে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ছাত্রলীগ নিধনের মিশনে নেমেছে। তবে আমি ছাত্রলীগের সভাপতি থাকা অবস্থায় কোনও কর্মীকে নামতে দেওয়া হবে না। যদি কোনও কর্মীকে নামাতে হয় তবে আমাকে বহিষ্কার করেই নামাতে হবে।

প্রাধ্যক্ষকে সংহতি জানাতে সোহরাওয়ার্দী হলে দুই শিক্ষক

এদিকে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের নামি দিয়ে বৈধ শিক্ষার্থীদের সিটে তুলে দেওয়ার অভিযানের কথা শুনে প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে সংহতি জানাতে সোহরাওয়ার্দী হলে আসেন দুই শিক্ষক। তারা হলেন- আরবি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ইফতেখার আলম মাসউদ ও অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দীন খান। প্রায় ঘণ্টাখানেক হলে অবস্থান করে তারা চলে যান।

এ বিষয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দীন খান বলেন, সোহরাওয়ার্দী হলের প্রাধ্যক্ষ যে উদ্যোগ নিয়েছেন এটি নিঃসন্দেহে ভালো। গণমাধ্যমের সূত্রে জানতে পেরেছি, তাকে অভিযান বন্ধে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা এসেছি তাকে সংহতি জানাতে। আমরা অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে আছি।

তবে প্রভোস্ট কাউন্সিলের আহ্বায়ক বলেছেন, তারা নিজেদের মতো কাজ করছেন। তাই আমরা চলে যাচ্ছি।

হল প্রশাসনের বক্তব্য

হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বলছেন, প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক এলেই অভিযান শুরু হবে। তিনি আহ্বায়ক মিটিংয়ে আছেন। এদিকে অনড় অবস্থানে রয়েছে ছাত্রলীগ। তারা বলছেন, প্রভোস্ট সাবেক ছাত্রদল নেতা। তিনি আবাসিকতার আবেদন করা সত্ত্বেও ছাত্রলীগের রাজনীতি করায় তাদেরকে আবাসিকতা দেওয়া হয়নি। তাই তারা সিট থেকে নামবে না।

দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে মিটিং

বিকাল সাড়ে ৫টার পর সোহরাওয়ার্দী হলে আসেন প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ফেরদোসী মহল। পরে তিনি হল প্রাধ্যক্ষের কক্ষে মিটিংয়ে বসেন। ঘণ্টাখানেক পর মিটিং যোগ দেন ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক তারেক নূর।

অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে ফেরদৌসী মহল বলেন, সময় হলে অভিযান শুরু করবো। কখন নাগাদ অভিযান শুরু হবে এমন প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে মিডিয়াকর্মীদের প্রাধ্যক্ষের কক্ষের সামনে থেকে সরে যেতে অনুরোধ করেন।