অদম্য মাহিনুরের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার গল্প


রিজভী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় | Published: 2021-10-29 21:42:08 BdST | Updated: 2021-12-04 08:25:07 BdST

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ২য় বর্ষেই হন ফুটফুটে এক সন্তানের জননী। পারিবারিক ব্যাস্ততা, সন্তান দেখাশোনা ও শশুরবাড়ির দায়দায়িত্ব কাঁধে নিলেও স্বপ্ন থেকে পিছ পা হননি এই অদম্য নারী। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে সর্বোচ্চ মেধার পরিচয় দিয়ে হয়েছেন নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য নিয়োগ পাওয়া গণিত বিভাগের শিক্ষক মাহিনুর আক্তার।

মাহিনুর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার শরাফতি গ্রামে মধ্যবিত্ত একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা হাজী মোহর আলী পেশায় ব্যবসায়ী এবং মা রেখা আক্তার একজন গৃহিণী। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়।

২০০৩ সালে শরাফতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান। এছাড়াও ২০০৮ সালে শরাফতি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথমবারের মতো জিপিএ ৫ এবং ২০১০ সালে বরুড়া শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজ থেকে ৪.৮০ জিপিএ নিয়ে কলেজ জীবন শেষ করেন। পড়াশোনার সব স্তরেই তাঁর সেরাটা দিয়েছেন মাহিনুর।

সাফল্যের ধারাবাহিকতায় উচ্চ মাধ্যমিকের পর একটু হোঁচট খান মাহিনুর। ছোট বেলা থেকেই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিলো। কিন্তু মেডিকেল কলেজে চান্স না পাওয়ায় ভর্তি পরীক্ষা দেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মনস্থির করেন গণিত বিভাগেই পড়বেন। শুরু হল নতুন এক অধ্যায়।

 .

পরিবারের সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বর্ষে বৈবাহিক জীবন শুরু করেন মাহিনুর। সময়ের পালাবদলে দ্বিতীয় বর্ষে প্রথম সন্তানের জননী হন তিনি। স্বামী কাজী বিল্লাল হোসাইন সবুজ সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার। সন্তান ও স্বামী-সংসারের পাশাপাশি শ্বশুর বাড়ির দায়িত্বও চলে আসে তার উপর। তবুও তিনি পিছপা হননি। চালিয়ে গেছেন নিজের পড়াশোনা এবং সংসার। আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেছেন সামনের দিকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষায় ৩.৬৩ জিপিএ পেয়ে বিভাগে প্রথম হন। এর পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন যেন তাকে তাড়া করতে শুরু করল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম থেকেই ভালো ফলাফল অর্জন করায় তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভাগের সকলের নজরে চলে আসেন। এ ধারাবাহিকতা ধরে রেখে তিনি স্নাতকে সিজিপিএ ৩.৮৭ এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সিজিপিএ ৪.০০ অর্জনের মাধ্যমে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন।

স্নাতকে বিজ্ঞান অনুষদ থেকে তিনি সর্বোচ্চ সিজিপিএ অর্জন করায় "প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক-২০১৭" এবং একইসাথে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে নিজ অনুষদে সর্বোচ্চ সিজিপিএ অর্জন করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক "চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড -২০২০" লাভ করেন।

সন্তান, সংসার, স্বামী সবকিছু সামলিয়ে জীবন সংগ্রামে জয়ী হওয়া মাহিনুর অবশেষে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে তার সেই স্বপ্নের পূর্ণতা পেয়েছেন। এক্ষেত্রে স্বামী, পরিবার এবং আত্মীয় স্বজনের সর্বোচ্চ সহযোগিতা পেয়েছেন তিনি।

অনুভূতি জানতে চাইলে মাহিনুর আকতার বলেন, প্রথমে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। শিক্ষক হওয়ার জন্য আমার আত্মবিশ্বাস আর প্রচেষ্টা কোনটারই কমতি ছিলো না। পাশাপাশি আমার বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ী, আমার স্বামী,পরিবার, আমার শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক এবং বন্ধু-বান্ধবদের অনেক অনুপ্রেরণা এবং ত্যাগ তিতিক্ষা ছিল। আমার স্বামী বন্ধুর মতো সব সময় আমার পাশে ছিলেন। আমি মাননীয় উপাচার্য মহোদয়ের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ কারণ তিনি আমার মেধার মূল্যায়ন করেছেন। সর্বোপরি যারা আমার পাশে থেকে সব সময় আমাকে সাহস যুগিয়েছেন সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।