ভারতীয় ধারাবাহিকে দর্শকের কেন এত আগ্রহ?


Dhaka | Published: 2021-10-02 18:22:26 BdST | Updated: 2021-10-16 02:41:44 BdST

একটা সময় ছিল যখন ভারতীয়রা আমাদের চ্যানেলের সামনে মুখিয়ে থাকত কখন শুরু হবে তাদের কাঙ্ক্ষিত অনুষ্ঠানটি। সময়টা খুব বেশি আগের নয়, সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশকে হবে, তখন ভারতে বাংলাদেশ টেলিভিশন দারুণ জনপ্রিয় ছিল। বিটিভিতে সম্প্রচারিত নাটক ভারতের ঘরে ঘরে চলত। অথচ আজকের অবস্থানে দাঁড়িয়ে তা শুধু গল্পই বৈ-কি।

এখন আমাদের ঘরে ঘরে ভারতীয় চ্যানেল আর ধারাবাহিকে সয়লাব। কোথাও স্টার জলসা, কোথাও স্টার প্লাস, আবার কোথাও বা জি বাংলা। সেসবের বিপরীতে দেশীয় সংস্কৃতি আজ নিদারুণ হুমকির পথে। এরই ধারাবাহিকতায় বন্ধ হল সকল বিদেশি চ্যানেলের সম্প্রচার। কিন্তু শুধুমাত্র বিদেশি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করেই কি দর্শককে দেশীয় চ্যানেলমুখী করা সম্ভব? ভারতীয় ধারাবাহিকে দর্শকের এত কেন আগ্রহ সেটি নিয়ে কতটুকু ভেবেছি আমরা?

কী আছে ভারতীয় ধারাবাহিকে যা আমাদের নেই?

ভারতীয় সিরিয়ালগুলোর গল্পগুলো এমন হয় যেখানে থাকে পরিবারের সব সদস্যের চরিত্রের উপস্থিতি। পারিবারিক একটা ইমোশন থাকে যেটি দর্শককে তথা নারী সমাজকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে। যা আমাদের দেশীয় নাটকে খুব কমই দেখা যায়। অতিরঞ্জিত কমেডি, রোমান্স কিংবা মূল চরিত্র কেন্দ্রীক অভিনয়েই নাটকের সমাপ্তি ঘটে। যার ফলে দর্শকের পারিবারিক ইমোশনের জায়গাটায় বড়সর একটা গ্যাপ থেকে যায়।

⚫আরেকটি বিষয় যেটি না বললেই নয়, সেটি হচ্ছে টিভি চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপনের আধিক্যতা। আপনি এক ঘন্টার একটা নাটক দেখতে বসবেন, ৩ মিনিট নাটক চললে ৭ মিনিট চলে বিজ্ঞাপন। মাঝখানে খবর তো রয়েছেই। এভাবে এক ঘন্টার কোনো নাটক দেখার ইচ্ছা থাকলে আপনাকে হাতে দুই থেকে আড়াই ঘন্টা সময় নিয়ে বসতে হবে। এখন কথা হচ্ছে, মানুষের কি এত সময় আছে? এত সময় এবং ধৈর্য্য কি থাকে যেখানে অন্যান্য মাধ্যমে হরহামেশাই কম সময়ে অনেক বেশি বিনোদন পাওয়া যায়? ভারতীয় চ্যানেলের ধারাবাহিকগুলোর দিকে যদি নজর দেন দেখবেন ৩০ মিনিটের একটা ধারাবাহিকে সর্বসাকুল্যে মাত্র ৮/৯ মিনিট বিজ্ঞাপন থাকে। তাহলে দর্শক কোনটা বেশি পছন্দ করবে? অবশ্যই সময় বাঁচিয়ে বেশি বিনোদনটাই।

⚫এবার আসি অনুষ্ঠানসূচির সময়ের হেরফেরের কথা। যদি একটা অনুষ্ঠান নাটক কিংবা টকশো'র সময় নির্ধারিত থাকে রাত ৯:০৫ -এ, তাহলে তখন চ্যানেলে গিয়ে দেখবেন বিজ্ঞাপন হচ্ছে নয়তো খবর হচ্ছে। অর্থ্যাৎ কাঙ্ক্ষিত অনুষ্ঠানটি শুরু হতে হতেও বেশ কালক্ষেপণ হচ্ছে। কিন্তু ভারতীয় চ্যানেলগুলোতে সময়টা খুব ভালোভাবে মেইনটেইন করা হয়। তাছাড়াও ভারতীয় ধারাবাহিকগুলো প্রতিদিন হওয়ায় দর্শকের মনে একটা আগ্রহ জমে থাকে এবং অ্যাডিকশন জন্মে যায়।

⚫অন্যদিকে বিদেশের বিয়েলিটি শো-গুলোতে যে লেভেলের চমক আর গুছানো থাকে, আমি দেখিনি বাংলাদেশের কোনো রিয়েলিটি শো-তে এমনটা হতে। ইভেন 'ইত্যাদি' ছাড়া আমাদের কোনো রিয়েলিটি শো বিদেশের বিশেষ করে ভারতীয়দের ধারেকাছেও নেই। উপস্থাপনাতেও স্পষ্টত একটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

⚫টিভি নাটক, সিনেমা সবই ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে এক কাহিনী এক মুখ। দুঃখজনক হলেও সত্যি টিভি নাটকগুলো গুনগত মানের দিক থেকে দিনদিন শুধু পিছিয়ে পড়েছে।

⚫ভারতীয় সিরিয়ালগুলো অনেক বেশি গুছানো এবং তারা প্রচারেই প্রসার ঘটায়। প্রতিটি নতুন অনুষ্ঠান বা সিরিয়াল আসার আগে দারুণভাবে প্রমো ভিডিও দিয়ে দর্শককে আকৃষ্ট করে। যা দেশীয় চ্যানেলগুলো বা প্রযোজকেরা করতে পুরোপুরি ব্যর্থ বলা যায়। আর বাজেট স্বল্পতার বিষয়টি তো রয়েছেই।

⚫ভারতের সেসব চ্যানেল এবং ধারাবাহিক নির্মাতাদের টার্গেট অডিয়েন্স হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, বাংলাদেশসহ বাংলা ভাষাভাষী এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে সমমনা অঞ্চলগুলো। কিন্তু বাংলাদেশ তাদের টার্গেট অডিয়েন্স ধরতে ব্যর্থ। মার্কেট পলিসিতে অনেকাংশেই এগিয়ে গেছে ভারতীয়রা।

⚫তারপর আসি নিউজ টকশোর কথায়। প্রতিটি চ্যানেলে একই রকম রাজনৈতিক টকশো, খবর, নাটক প্রচারিত হয়। অনুষ্ঠানে তেমন কোনো বৈচিত্র্যতা নেই। টকশো'র মানুষগুলোও এক, ইস্যুগুলোও এক। যার ফলে মূল বক্তব্যও এক। তাহলে দর্শক একই জিনিস কেন বারবার দেখবে?

⚫এরচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে সংবাদমাধ্যমেরও স্বাধীনতা দিতে হবে। অনেক তথ্য অপ্রকাশিত থেকে যায়, আবার অনেক ইস্যু খুব বিশ্রীভাবে উপস্থাপন করা হয়। মানুষ এখন নিউজের জন্য টিভি দেখতে চায় না, এরচেয়ে ভুঁইফোড় ইউটিউব চ্যানেলগুলোতেই বেশি ভরসা করে ফেলে।

তাহলে এবার বলুন তো দর্শক টাকা দিয়ে এতকিছু কম্প্রোমাইজ করে দেশীয় চ্যানেল কেন দেখবে! দিনশেষে দর্শক বিনোদন চায়, প্রোডাক্টিভ কিছু চায়। তাই বিদেশী চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধের আগে এই বিষয়গুলোতে চ্যানেল মালিক, প্রযোজক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সুদৃষ্টি দিতে হবে। তবেই দর্শককে দেশীয় চ্যানেলমুখী করা সম্ভব হবে। অন্যথায় বিদেশি চ্যানেল বন্ধ করে কার্যত কোনো লাভ হবে না। বাতির নিচের অন্ধকার অন্ধকার-ই থেকে যাবে।

তামান্না আক্তার
শিক্ষার্থী, ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়