বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট


ঢাকা | Published: 2024-06-05 04:05:59 BdST | Updated: 2024-07-15 03:17:57 BdST

প্রতিবছরের ন্যায়বছরও ৫ই জুন পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ভুমি পুনরুদ্ধার, মরুময়তা এবং খরা সহনশীলতাবাংলাদেশ সরকার এর বাঙলা ভাবানুবাদ করা করেছে করবো ভূমি পূনরুদ্ধার, রুখবো মরুময়তা/ অর্জন করতে হবে মোদের খরা সহনশীলতা”। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক কর্মসূচীর সবচেয়ে বড় এই আয়োজনের বারের আয়োজক সৌদি আরবপ্রতিপাদ্যের উপজীব্য বিষয় এবং আয়োজক দেশের প্রতিবেশপরিবেশের দিকে তাকালে আয়োজনের উদ্দেশ্য তাৎপর্য সহজেই প্রতীয়মান হয় বছরের নির্ধারিত এই প্রতিপাদ্যের সাথে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটকরণীয় সম্মন্ধে বিশদ আলোচনার দাবী রাখে 

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে অবস্থিত এবং মৌসুমী বায়ূপ্রবাহ দ্বারা প্রভাবিতপৃথিবীর অন্যতম কয়েকটি বায়োডাইভার্সিটিহটস্পট এলাকা যেমন ইন্দো-মালায়ান, ইন্দো-বার্মাসুন্দরবন অঞ্চলদ্বারা পরিবেষ্টিত বলে এই অঞ্চল জীববৈচিত্রপূর্ণ  হওয়া স্বাভাবিকএছাড়া রয়েছে বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলআরও রয়েছে  বিপুলসংখ্যক নদী-নালা, খাল-বিল এবং অন্যান্য জলাশয় যা জীব বৈচিত্র সহায়কতাই এই ভূখন্ডতে মরূময়তার ঝুঁকি না থাকার কথাকিন্তু প্রকৃতপক্ষে নানাবিধ কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে মরুময়তার ঝুঁকিতে রয়েছেবনাঞ্চল কমে যাওয়া, পানির স্তর নেমে যাওয়া, জমিতে দীর্ঘ মেয়াদে সেচ প্রদান, অজৈব সার প্রয়োগ, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েলবনাক্ত জমির পরিমান বেড়ে যাওয়া, লবনাক্ত পানির চিংড়ী চাষ, জলাশয় ভরা হওয়া, নগরায়ন, অবকাঠামো নির্মাণসহ নানাবিধ কারণ বাংলাদেশে রুময়তা ঝুঁকি তৈরি করছেদীর্ঘ মেয়াদে বৃষ্টিপাত না হলে রার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়াও, অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত খরার অন্যতম প্রধান কারণখরা বাংলদেশের কৃষি উৎপাদনকে ব্যাহত রার মাধ্যমে আর্থ সামজিক সমস্যার সৃষ্টি করেখরা জীববৈচিত্র হ্রাস এবং নানবিধ রোগ বালাই এর অন্যতম কারণজলবায়ূ পরিবর্তন জনিত কারণে খরার প্রকোপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছেবাংলাদেশে মৌসুমীবায়ু প্রবাহজনিত বৃষ্টিপাত ক্রমাগতভাবে বিলম্বিত হচ্ছেযার ফলে এপ্রিল-মে মাসে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং খরার ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাচ্ছেএইবছর বাংলাদেশসহ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতমিয়ানমার এর উপর দিয়ে স্মরণ কালের তীব্রতর তাপপ্রবাহ বয়ে গিয়েছে।        

মরুময়তা এবং খরার প্রকোপ প্রশমন করা এবং এর সাথে খাপ খাইয়ে চলার টেকসই উপায় এবং পদ্ধতি বে করা এখন জরুরীএই লক্ষে আমাদের জো দিতে হবে বনাঞ্চলের পরিমাণ বাড়ানো দিকে এবং একই সাথে প্রাকৃতিক বনাঞ্চলকে সংরক্ষণ করা দিকেআমাদের প্রতিবেশী ভারত এবং মিয়ানমারের সংরক্ষিত অঞ্চল যথাক্রমে ৫.২৮%, ৬.৪২%। আর সেখানে বাংলাদেশের সংরক্ষিত অঞ্চল ২% ভাগেরও কম যা লক্ষমাত্রা ১৭% এর অনেক নীচেদক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে নেপালভুটান এই লক্ষমাত্রা অর্জন করেছেসংরক্ষিত অঞ্চল শুধু বনাঅঞ্চলকেই বুঝায় নাজলাশয় সংরক্ষিত এলাকাভুক্ত হতে পারেক্ষেত্রে বাংলদেশের একটি সুবিধা হল এখানে রয়েছে অনেক নদী-নালা, খাল-বিল বং অন্যান্য জলাধার। এ গুলোকে সংরক্ষিত অঞ্চলহিসেবে ঘোষণা করে আমরা আমাদের সার্বিক সংরক্ষিত অঞ্চল বাড়াতে পারি যেহেতু আমাদের বনাঞ্চল কম তাই জলাশয়গুলো যথাযথ সংরক্ষণ করে আমাদের জীববৈচিত্রকে সমৃদ্ধ করতে পারিএবং একইসাথে মরুময়তাকেও রোধ করতে পারি

জীববৈচিত্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আমদেরকে প্রাধান্য দিতে হবে প্রাকৃতিক আবাসস্থলসমূহ সংরক্ষণ করাকেকোনো একটি প্রাকৃতিক আবাস্থল যথাযথ সংরক্ষণ করা গেলে সেখানে অবস্থিত সকল উদ্ভিদ ও প্রাণি জগত এমনকি অণুজীবসমূহ সংরক্ষণের আওতায় চলে আসেতাই সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি বা দুইটি মাত্র প্রজাতি কেন্দ্রিকসংরক্ষণ-ব্যাবস্থাপনা ধারণা থেকে বের হয়ে প্রাকৃতিক আবাস্থল সংরক্ষণে উপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে

জলাশয় সমূহ জীববৈচিত্রের অন্যতম প্রধান আধার এই জলাশয় সংরক্ষণের মাধ্যমে জীব-বৈচিত্র সংরক্ষণে করা সম্ভববাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশদেশের অর্থনীতিতে এদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণতাই এসমস্ত নদী সংরক্ষণ করে অর্থনীতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য দুটিই রক্ষা করা যায়নদী ভরাট হওয়া বা তলানি জমা একটি প্রাকৃতিক স্বাভাবিক প্রক্রিয়াউজানের পলি ভাটি এলাকায় জমে ধীরে ধীরে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনাতাই নদী সচলরাখার জন্য নদী খনন করা প্রয়োজননদীর দূষণ রোধ করা অপরিহার্যদুষণের প্রধান্ত কারণ শিল্প বর্জ্য, নৌযান থেকে নির্গততৈল, কৃষিজমির অজৈব সার, কীট নাশক ইত্যাদি এবংনগরেরজৈববর্জ্যএই গুলি বন্ধ করা না গেলে নদী রক্ষা করা সম্ভব হবে না যেসমস্ত জলাশয় ইতোমধ্যে দূষিত হয়ে গেছে সেগুলোর প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত জরুরীঅধিক দূষিত জলাশয় কিংবা প্রাকৃতিক বাস্থানসমূহকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে তাদেরকে সংরক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা আবশ্যক

বাংলাদেশে নগরায়ণ দ্রুত গতিতে হচ্ছেআগামী ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের ৫৬ % মানুষ নগরে বসবাস করবেঅর্থাএখনকার অনেক গ্রামাঞ্চল তখন নগরে পরিণত হবেতাই নগরসমুহে প্রাকৃতিক ভাবে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রাখার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত সবুজায়ন জলাধার বর্তমান যুগেনগর বনায়নধারণা জনপ্রিয় হচ্ছেযেখানে ছোট ছোট এলাকা জীববৈচিত্রপূর্ণ সবুজ এলাকা রূপান্তরিত করা হয়পৃথিবীর অনেক দেশে খন এই ধরণের মডেল ব্যবহার করে সবুজায়ন করা হচ্ছেআমাদের দেশেও এই মডেল অনুসরণ করে নগরে সবুজায়ন করে নগরকে পরিবেশবান্ধব বসবাস উপযোগী করা সম্ভবএটি একইসাথে মরুকরণ রোধসহ খরা সহনশীলতা অর্জনে সহায়তা করবে

বাংলাদেশের মতো ঘন জনবসতিপূর্ণ দেশে জমির সংকট প্রকটবাণিজ্যিক কর্মসংস্থানের চাহিদার জন্য এদেশের শহরগুলোতে জায়গার চাহিদা অধিক। এ কারণে এখানে ঘনবসতিপুর্ণ আবাস্থান বাণিজ্যিক ভব বৃদ্ধির ফলে খোলাউন্মুক্ত জায়গা কমে যাচ্ছেএমতাবস্থায় বিদ্যমান উন্মুক্ত স্থানসমূহ সাধারণ মানুষের বিচরণের জন্য উদ্যান কিংবা পার্কে পরিণত করা প্রয়োজন। এ গুলো শুধু প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ন্যই নয় বরং মানুষের চিত্ত বিনোদনের জন্য প্রয়োজন

বাংলাদেশের কৃষি জমিসমূহ রয়েছে মরুকরণের ঝুঁকিতেজলবায়ূ পরিবর্তনজনিত কারণে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে ও বৃষ্টিপাতের হার কমে যাচ্ছেএকই সাথে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নীচে নেমে যাচ্ছেএই অঞ্চলে অধিক বাষ্পীভবন এবং ভূ-গর্ভস্থ পানিউত্তোলনের ফলে ক্রমাগতভাবে মরুকরণের ঝুঁকিতে রয়েছেভূ-গর্ভস্থপানি ব্যবহার করে সেচ কাজ করার ফলে জমিতে লবণাক্ততাও ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছেএর ফলে জমির উর্বরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে জমির পাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছেঅন্যদিকে দেশের উপকূল অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস এবং লোনাপানির চিংড়ী চাষের ফলে লবণাক্ততাও বৃদ্ধি পাচ্ছেএর ফলে এই অঞ্চলের মাটিশারীরবৃত্তীয় রা” ‘র ঝুঁকিতে রয়েছে।  

পরিশেষে বলতে হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস শুধুমাত্র দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে নাপ্রয়োজন প্রতিপাদ্য বিষয় কেন্দ্রিক কর্মসুচীগ্রহণ করাস্বল্প দীর্ঘ মেয়াদী সময়োপযোগী কর্মসূচী গ্রহণ রে দেশেরমরুকরণ রুখতে রুখতে হবেএকই সাথে প্রয়োজন প্রাকৃতিক বাস্থানসমূহকে পুনরুজ্জীবিত করাজমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকরা, খরা সহনশীল ফসল উদ্ভাবনচাষাবাদ রপ্ত করা এবং দূষন রোধকারী কর্মসূচী গ্রহণ করামানুষকে সচেতন করা এবং পরিবেশ রক্ষার লক্ষে প্রণীত সকল আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন করা

লেখক: অধ্যাপক ডঃ মুহাম্মদ জাবেদ হোসেন, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ এবং প্রাধ্যক্ষ, ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল, ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়