একই সঙ্গে তিন বন্ধুর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন জয়


Desk report | Published: 2024-05-13 18:03:21 BdST | Updated: 2024-05-29 09:37:46 BdST

মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশেষ সম্পর্কের নাম বন্ধুত্ব। ‘একজন সত্যিকারের বন্ধু তোমাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’ আইরিশ কবি অস্কার ওয়াইল্ডের এই উক্তিরই যেন প্রতিফলন যেন মামুনুর রশীদ, সুমন আলী ও নাঈম হোসেন। তারা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।

দেশের তিন প্রান্ত থেকে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এরপর ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। একই সঙ্গে পড়াশোনা করতেন তারা। তিন সহপাঠীর বিবিএ এবং এমবিএ সিজিপিএ একই। তারা সকলেই বিবিএ তে ৩.৮৪ এবং এমবিএ ৩.৯৩ অর্জন করেন। তারা স্বপ্ন দেখতেন বিদেশে গিয়ে উচ্চিশিক্ষা গ্রহণের। আর এজন্য আইইএলটিএস, জিআরই ও রিচার্সসহ বিভিন্ন প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন একইসঙ্গে। এমবিএ শেষ করার আগেই সবারই বেশ কিছু পাবলিকেশনও প্রকাশ হয়। এবছর তারা তিনজনই যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফুল ফান্ডেড পিএইচডি এডমিশন অফার পেয়েছেন। আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তারা পাড়ি জমাবেন যুক্তরাষ্ট্রে। সুমন আলী যাবেন University of Texas at El Paso (পিএইচডি ইন ফাইন্যান্স), মামুনুর রশিদ যাবেন University of Texas San Antonio (পিএইচডি ইন ফাইন্যান্স) এবং নাঈম হোসেন যাবেন University of New Orleans (পিএইচডি ইন ফাইন্যান্সিয়াল ইকোনমিকস)।

বিবিএ পড়াকালীন ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে গবেষণার কাজ শুরু করেন তারা। মোঃ নাঈম হোসেন লালন শাহ হলের ২১৯ নং রুমে, মোঃ মামুনুর রশিদ লালন শাহ হলের ৩১৮ নং রুমে, এবং মোঃ সুমন আলী জিয়া হলের ৪৩২ নং রুমে থাকতেন। রিসার্চ শুরু প্রথম দিকে লালন শাহ হলের কমন রুমে কাজ করতেন তারা। করনাকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে একটা রুম ভাড়া নিয়ে তারা রিসার্চের কাজ করেন। ইতোমধ্যে মোঃ নাঈম হোসেনের ৭ টা রিসার্চ পাব্লিশড, মোঃ মামুনুর রশিদের ১০ টা এবং মোঃ সুমন আলীর ৬ টা রিসার্চ পাবলিশড হয়েছে। এছাড়া তাদের প্রত্যেকেরই কিছু পেপারস প্রসেসিং এ আছে বলে জানান তারা।

সফলতার গল্প জানতে চাইলে তারা বলেন, যখন আমাদের রির্সাচগুলো বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশ হয়। রির্সাচের পাশাপাশি আমরা আইইএলটিএস ও জিআরইয়ের প্রস্তুতিও নিতে থাকি। আইইএলটিএস, জিআরই ও পাবলিকেশন থাকায় আমাদের ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ পেতে সহজ হয়। তবে আমাদের যাত্রাটা অতোটা সহজ ছিল না।

তারা বলেন, আমাদের অনার্স থেকে এই পর্যন্ত সবকিছু কেমন যেন আল্লাহ মিলিয়ে দিয়েছেন। অনেকেই আমাদের অনেক বিষয়ে ঈর্ষা করলেও আমরা তিন বন্ধু কখনো তা করিনি বরং এগিয়ে এসেছি একে অন্যের সহযোগীতায় নিঃস্বার্থভাবে। আমাদের এই সফলতার পিছনে আমাদের সুপারভাইজার অধ্যাপক ড. বখতিয়ার হাসান স্যারের অবদান সবচেয়ে বেশি। বখতিয়ার হাসান স্যার আমাদেরকে হাতেকলমে গবেষণা শিখিয়েছেন। উনি সবসময় আমাদেরকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। দেশি এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষকদের সাথে গবেষণা করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন।

নাঈম হোসেন বলেন, মানুষের ভিন্নভিন্ন লক্ষ্য থাকে। বিসিএস অবশ্যই ভালো জব বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে। তবে, আমি কখনো সাধারণ জ্ঞান বা অনেক মুখস্থ পড়ায় আগ্রহ পেতাম না। অন্যদের মত আমার পরিবার থেকেও বিসিএসকে গুরুত্ব দিতেন। এমনকি যখন আমি গবেষণার জন্য লক্ষ্য ঠিক করি, আমার পরিবার প্রথমে নারাজ থাকলেও এখন তারা অনেক খুশি। যখন সৃজনশীল কিছু করতাম, অন্যরকম মজা পেতাম। যেটা মুখস্থ পড়া আর খাতায় নোট করার মধ্যে পেতাম না। বাংলাদেশের বর্তমান জব সেক্টর দেখলে খুবই হতাশ লাগে। তারপর যখন বিদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে জানলাম, পুরা ডেডিকেটেড হয়ে কাজ করেছি।'

তিনি আরও বলেন, আমার সফলতা পিছনে সবচেয়ে বেশি অবদান বলবো আমার বড় ভাইয়ের। একজন ভাইয়ের কি করা উচিত তার সর্বোচ্চটা সে করেছে। কোনো কিছুর কমতি সে কখনো আমার জন্য রাখেনি। সবসময় আমাকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

বন্ধুদের অবদান নিয়ে তিনি জানান, আমরা ৩ বন্ধু একসাথে কাজ করলেও মামুনের অবদান অনেক বেশি। সে সর্বদা সিরিয়াসলি বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতো, বলতে গেলে আমিই বেশি ফাঁকিবাজ ছিলাম। তবে আমরা প্রত্যেকে কোনো না কোনো বিষয়ে বিশেষভাবে অভিজ্ঞ ছিলাম। সেটা আমরা অন্যকে অতি সহজেই করে দিতাম, শিখিয়ে দিতাম। তাই প্রয়োজনীয় কোনো বিষয়ে আমরা হতাশ হতাম না। আমরা একে অন্যের ব্যর্থতায় অনুপ্রেরণা হয়ে অবতীর্ন হতাম। তাই বলবো আমাদের ৩ জনেরই সফলতার পিছনে তিনজনেরই প্রায় সমান অবদান আছে।

সফলতার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মামুনুর রশীদ বলেন, আমার জন্য এই সফলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ থেকে খুব কম শিক্ষার্থীই আছেন, যারা সরাসরি আমেরিকার ফাইন্যান্সের পিএইচডি তে সুযোগ পায়। ফাইন্যান্সের পিএইচডি প্রোগ্রামগুলো খুবই প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়। সেখানে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিভাগ তিন বন্ধু একসাথে পিএইচডিতে সুযোগ পাওয়া অনেক গর্বের। সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো তিন বন্ধু একসাথে পিএইচডি শুরু করা। আমরা তিনজনই একসাথে অনার্স চতুর্থ বর্ষ থেকেই গবেষণা শুরু করি। এখানে আমাদের তিনজনের সুপারভাইজার ড. বখতিয়ার হাসান স্যারের অবদান বলে শেষ করা যাবে না। উনি না থাকলে হয়তো আমরা এই স্বপ্ন দেখার সাহসই পেতাম না।

সুমন আলী বলেন, আমার বিভাগের এবং আমার পরিবারের জন্য এই সাফল্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সবচেয়ে মজার বিষয়, আমরা যখন ড. বখতিয়ার স্যারের পাবলিকেশন দেখতাম, তখন তিনজন আলোচনা করতাম আমারাও একদিন স্যারের সাথে পাবলিকেশন করবো।

ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. বখতিয়ার হাসান বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যবসায় শিক্ষার গবেষণা ওভাবে গড়ে ওঠেনি। সেক্ষেত্রে তাদের একটা লক্ষ্য ছিল বাইরের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবে। তাদের এই লক্ষ্য শুনে আমি সুযোগ করে দিয়েছি গবেষণার। তাদের পরার্মশ ও গাইডলাইন দিয়েছি। তারা তিনজনই ছিল অত্যন্ত মেধাবী এবং পরিশ্রমী। তবে এটা খুবই ব্যতিক্রমী যে তিন বন্ধু একই সাথে ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ পেয়েছে। একজন শিক্ষক হিসেবে এর চেয়ে আনন্দ ও গৌরবের আর কিছু হয়না। এটাই আমার সবচেয়ে বড় সফলতা।