রাবিতে বিলুপ্তির পথে কাঠবিড়ালি


Shoeb Shuvro | Published: 2024-03-31 23:20:08 BdST | Updated: 2024-04-14 19:26:25 BdST

কাঠবিড়ালি, দেশের অতি পরিচিত ক্ষুদ্রাকার একটি প্রাণী। তবে ছোট হলেও ক্ষিপ্রগতির জন্য বিখ্যাত। বছর খানেক আগেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সর্বত্রই দেখা যেত এই প্রাণীটির। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেট, টুকিটাকি চত্বর, পুরাতন ফোকলোর চত্বর, পশ্চিমপাড়া, স্টেডিয়ামের পার্শবর্তী গাছগুলোসহ সব জায়গাই ছিল কাঠবিড়ালির চেঁচামেচিতে মুখরিত।

কিন্তু বছরখানেক থেকে কাঠবিড়ালির সেই রাজত্ব আর দেখা যাচ্ছে না। একসময় যে ক্যাম্পাসে কাঠবিড়ালির কারণে কিছুটা বিরক্তই হতে হতো শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের, সেখানে এখন সারা দিন ঘুরেও দু-একটা চোখে পড়ছে না। প্রাণিবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রধানত গাছনিধন, বৈরী আবহাওয়া ও খাদ্যসংকটের কারণে এই প্রাণী ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ক্যাম্পাস থেকে।

রাবি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ও ক্যাম্পাসসংশ্লিষ্ট লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তাঁরা জানিয়েছেন, বছরখানেক আগেও ক্যাম্পাসের ছোট-বড় গাছে ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের এই প্রাণীর ছিল অবাধ বিচরণ। মূল গেট থেকে জোহা চত্বর পর্যন্ত রাস্তার দুইদিকে চোখে পড়ত দলে দলে দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে দেবদারুগাছে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া কাঠবিড়ালিদের।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা বলছেন, কাঠবিড়ালি শিকারিরা ধরে পাচার করে দিচ্ছে। এছাড়া জলবায়ুর পরিবর্তন, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের প্রয়োগ সর্বপোরি আবাসভূমি বিনষ্টের কারণে দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে।

তাদের দাবি, ক্যাম্পাসে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য গাছপালা কাটা হচ্ছে এবং জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে। ভবন নির্মাণ, উচ্চশব্দ, জলাশয়ে অনিয়ন্ত্রিত মাছ শিকারের ফলে পশু-পাখিদের অনূকূল পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ফলে ক্যাম্পাস হয়ে উঠেছে পশু-পাখির বসবাসের জন্য অনিরাপদ।

শুধু মূল গেট থেকে জোহা চত্বর পর্যন্তই নয়, প্যারিস রোড, জুবেরি ভবনসহ প্রতিটি ভবনের সামনের বাগান, শেখ রাসেল মাঠ, পশ্চিম পাড়া কিংবা ক্যাম্পাসের অন্যান্য বাগান ও রাস্তার পাশের গাছে দেখা মিলত কাঠবিড়ালির বিচিত্র কর্মকাণ্ডের। কিন্তু পরিবেশের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে ছটফটে ছোট্ট এই প্রাণী।

দিন দিন কাঠবিড়ালির সংখ্যা কমে যাওয়া বিষয়ে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মাহবুব হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মূলত বৃক্ষনিধনের কারণে এ ধরনের প্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। কাঠবিড়ালির জন্য যে ধরনের গাছ উপযোগী, সেই গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া খাদ্যসংকট আছে। ক্যাম্পাসের সর্বত্র মানুষের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় এদের বসবাসের জায়গা কমে গেছে। সব মিলিয়ে পরিবেশগত একটা ভারসাম্যহীনতার কারণে এই প্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে ক্যাম্পাসে।’

প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা বলেন, ‘মূলত ক্যাম্পাসে কনস্ট্রাকশনের কাজের জন্য এসব প্রাণীর আবাসস্থল কমে যাচ্ছে। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রাণীগুলো নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। ফলে এরাও সর্বত্র চলাফেরা করে না। এ ছাড়া ক্যাম্পাসে উচ্চ শব্দের কনসার্টের কারণে এদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়। ফলে এই প্রাণীগুলো ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।’

কাঠবিড়ালি ও অন্যান্য প্রাণী রক্ষায় প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ আছে কি না—এই প্রশ্ন করা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলামকে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কাঠবিড়ালি মূলত ক্যাম্পাসের গাছেই থাকে। এখন ফলফলাদির মৌসুম নয়।

সে জন্য হয়তো এদের আনাগোনা কমে গেছে। সামনে ফলের মৌসুম আসছে, তখন হয়তো এদের সংখ্যাও বাড়বে। এরপরও প্রাণীদের মধ্যে যেন ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি না হয়, সে জন্য কনসার্টে সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহারের নীতিমালা আমরা তৈরি করেছি। কনস্ট্রাকশনের বিষয়টিও আমাদের বিবেচনায় আছে। তবে আমরা যদি এই প্রাণীদের খাবারের ব্যবস্থা করতে পারি তাহলে এরা টিকে থাকবে। তাতে আমাদের জীববৈচিত্র্যও রক্ষা হবে। এ জন্য আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’