কাওয়ালি গানের ইতিহাস ও ঢাকায় কাওয়ালি সংগীত


Dhaka | Published: 2022-01-12 23:50:44 BdST | Updated: 2022-01-18 18:39:36 BdST

কাওয়ালি শব্দটি আরবি 'কওল' থেকে এসেছে। কওল-এর আভিধানিক অর্থ বলা। মূলত, এখানে রাসুল (সাঃ) সম্পর্কিত কথাবার্তাকেই নির্দেশ করা হয়েছে। এদিক থেকে কাওয়ালের অর্থ দাঁড়ায়, যিনি কথাগুলো (রাসুল স. সম্পর্কিত) বারবার উচ্চারণ করেন। কাওয়ালি সুফিদের গান। বহুকাল আগে সুফী-সাধকগণ খোদার প্রেমে মশগুল হয়ে বিশেষ কোনো নামের জিকির করতেন। অর্থাৎ, একই শব্দ বা বাক্য পুনরাবৃত্ত করতেন। সুরের মাধ্যমে এই পুনরাবৃত্তি ঘটলে তাকে কাওয়ালি বলা হতো। অষ্টম শতাব্দীতে পারস্যের বিভিন্ন সুফি আস্তানায় এধরণের গানের আসর বসতো। একে মাহফিল-ই-সামা নামেও অবহিত করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, ৯০০ খ্রিস্টাব্দে সুফি মতবাদ ও দর্শন বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। দার্শনিক কথাবার্তার সমন্বয়ে রচিত হওয়া এসব গানের আয়োজন তৎকালীন সুফিবাদ চর্চার অন্যতম মাধ্যম ছিল। কবি আবু হামিদ আল গাজ্জালি (১০৫৮-১১১১ খ্রিস্টাব্দ) এসব গান রচনার জন্য পরিচিতি লাভ করেছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত গজলের অন্যতম স্রষ্টা তিনি।

ভারতে সুফিবাদের মধ্যে চার ধরনের ধারা লক্ষ্যণীয়। এগুলো হল- চিশতীয়া, নিজামিয়া, সোহরাওয়ার্দীয়া এবং নকশেবন্দীয়া। চারধারার মধ্যে চিশতীয়া ধারার অনুসারীগণের মাধ্যমেই বেশিরভাগ কাওয়ালির প্রচার এবং প্রসার লাভ করে। চিতশীয়া ধারার প্রবর্তক হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতী (রা.) নিজেও এই ধর্মীয় গানের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। হযরতের বিখ্যাত শিষ্য ছিলেন কুতুবুদ্দদিন বখতিয়ার কাকী (রহ.) এবং দিল্লির নিজামউদ্দিন আউলিয়া (র.) প্রমুখ। বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত আছে যে, কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী (র.) সামা সংগীতে টানা কয়েকদিন মশগুল থাকতেন। এরপর নিজামুদ্দিন আউলিয়ার (র.) দরবারেও কাওয়ালির আসর বসতো। নিজামুদ্দীন আউলিয়ার (র.) প্রিয় শিষ্য হযরত আমির খসরু (র.) কাওয়ালি গানকে রীতিসিদ্ধ করেন। অর্থাৎ, কাওয়ালিকে একটি নিয়মের মধ্যে এনে প্রচার করেন তিনি। এজন্য তাকে কাওয়ালীর জনক বলা হয়। সুফিবাদ চর্চার পাশাপাশি তিনি একাধারে কবি, গায়ক এবং একজন যোদ্ধাও ছিলেন। তার উপাধি ছিল 'তুত-ই-হিন্দ' বা হিন্দের তোতা পাখি।


সুফি নৃত্যের ইলাস্ট্রেশন
একাদশ-দ্বাদশ শতকে সুফিরা উপমহাদেশের মুলতান এবং পাঞ্জাবে আসেন। ক্রমেই তারা বিহার, বাংলা এবং দক্ষিণে তাদের বসবাস গড়ে তোলেন। তাদের মাধ্যমেই পারস্যের কবিতাগুলো চিশতীয়া তরিকার সুফি হযরত আমির খসরু (রহ.) এর কাছে চলে আসে। তিনি এসব কবিতার সাথে স্থানীয় ভাবধারা যুক্ত করে কাওয়ালির পূর্ণাঙ্গ রূপদান করেন। আমির খসরু হিন্দি, পূরবী এবং ফারসি ভাষায় তার কাওয়ালি গানগুলো রচনা করেছিলেন। 'খেয়াল' নামক আরেক প্রকার গানেরও স্রস্টা তিনি। জানা যায়, তিনি প্রয়োজন মতো একতারা, তবলা ইত্যাদি বানাতেন। তার পীর নিজামউদ্দিন আউলীয়া (র.) দরবারে প্রায়ই একতারা বাজিয়ে কাওয়ালি করতেন।

বাংলায় কাওয়ালিকে কে বা কারা সূচনা করেছেন তার সম্পর্কে সঠিক কোনো ইতিহাস পাওয়া যায়না। এদেশে সুফিগণ আসার পরে তারাও কাওয়ালি করতেন। ঐতিহাসিক ড. মুহাম্মদ এনামুল হকের মতে, চিশতীয়া তরিকার সাধকেরা সামা গানের তালে দাঁড়িয়ে নৃত্য করতেন। একপর্যায়ে তারা ভাবগ্রস্ত হয়ে পড়লে তখন তাকে চরম পর্যায় বলে গণ্য করা হতো। সুফী মতানুসারে এ অবস্থার নাম 'ফানা হওয়া'। কাওয়ালির মাধ্যমে খোদার প্রেমে মগ্ন হবার কথা সাধক খাজা মইনুদ্দিন চিশতীও বলতেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় বাংলাতেও সুফি সাধকদের দরগা থেকেই কাওয়ালির প্রসার হয়।

ঢাকায় কাওয়ালি সংগীত

ঢাকায় বহু পীরের দরগা শরিফ রয়েছে। ঢাকার নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে বহু সুফির মাজার। বাংলার সুফীগণ অধিকাংশই চিশতিয়া তরীকার অনুসারি। চিশতিয়া দরবারের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল কাওয়ালি। সে হিসাবে এসব মাজারেও কয়েক শতক ধরে কাওয়ালি সংগীত প্রচলিত আছে। আবার, ঢাকার নবাবদের বিনোদনের অন্যতম উৎস ছিলো কাওয়ালি। শুরুতে নবাবের অনুরোধে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাওয়ালগণ বাংলাতে আসতেন। নবাবরা তখন কাওয়ালির ভক্ত হয়ে যান। ঢাকার লোকজন তখন কাওয়ালি চর্চা শুরু করেন। এক পর্যায়ে ঢাকার কাওয়ালগণও নবাবদের আসরে কাওয়ালি পরিবেশনের সুযোগ পান। নবাবরা নানা সময় কাওয়ালদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এভাবে, ঢাকার সংস্কৃতির ইতিহাসে কাওয়ালি বিশেষ জায়গা দখল করে নেয়।