সাহিত্য এবং আমরা


শিবলী নোমান | Published: 2025-03-31 18:33:14 BdST | Updated: 2025-04-04 16:26:08 BdST

সাহিত্য মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা মানুষের অনুভূতি, চিন্তাকল্পনাকে প্রভাবিত করেএটি আমাদের সমাজেরপ্রতিচ্ছবি এবং মানুষের নৈতিকবুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের একশক্তিশালী উপকরণসর্বদাই সাহিত্য আমাদের জীবনেরগভীরভাবে প্রভাব ফেলেছেতবে বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সাহিত্যেরগুরুত্ব কিছুটা কমে গেছে, যা আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জতাইসাহিত্যচর্চাকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন আরবাড়ছে


প্রাচীন সাহিত্য থেকে আধুনিক সাহিত্যসব ধরনের সাহিত্যইমানবজীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠেরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজীনজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং অন্যান্য মহানসাহিত্যিকদের রচনায় মানুষের সুখ, দুঃখ, আশা-নিরাশারবিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়এই সাহিত্য সমাজের বিকাশে সাহায্যকরে এবং মানুষকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেসাহিত্যসমাজে অন্যায়দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টিতে সাহায্যকরেউদাহরণস্বরূপ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের "পথেরপাঁচালী" গ্রামীণ দারিদ্র্যের বাস্তব চিত্র প্রকাশ করেছে, এবং জর্জঅরওয়েলের "1984" রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ভয়ঙ্কর রূপ তুলেধরেছেহুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসগুলোও সমাজের বাস্তব চিত্রতুলে ধরে এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে

বিজ্ঞাপন


সাহিত্য (কবিতা এবং গদ্য) অন্য শিল্পমাধ্যমের তুলনায় শ্রেষ্ঠ, কারণ এটি মানুষের কল্পনা, চিন্তা এবং আবেগকে গভীরভাবেনাড়া দিতে পারেইংরেজি সাহিত্যের রেনেসাঁ যুগের একজনগুরুত্বপূর্ণ কবিসাহিত্য সমালোচক স্যার ফিলিপ সিডনি তাঁর"The Defence of Poesy" (বা "An Apology for Poetry") রচনায় দেখিয়েছেন যে কবিতা শুধুমাত্র বিনোদন নয়, এটিইতিহাস এবং দর্শনের চেয়ে শ্রেষ্ঠতরসিডনির মতে, কবিতা তথ্যদেয় না শুধু, বরং নৈতিক শিক্ষাকল্পনার সমন্বয়ে মানুষেরমনকে অনুপ্রাণিত করেআমেরিকান লেখক স্টিফেন কিং মনেকরেন, “সাহিত্য সিনেমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, কারণ এটি পাঠকেরকল্পনার উপর নির্ভরশীল, যেখানে প্রতিটি পাঠক নিজস্বভাবেগল্পের অভিজ্ঞতা গ্রহণ করতে পারে।” তাই একথা এখনঅনস্বীকার্য যে, সাহিত্য মানুষের ভাবনাঅনুভূতিকে সবচেয়েগভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে এবং এটি জনজীবনে অত্যন্তপ্রয়োজনীয়


আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে আমরা আমাদের শিল্প, সংস্কৃতিএবং সাহিত্যের গুরুত্ব প্রায় ভুলে যাচ্ছিসময়ের অভাবে আমরাসবার কাছে সংক্ষিপ্ত সংস্করণ গ্রহণের দিকে ঝুঁকছি, কিন্তু অনুভবকরছি যে মানুষের আবেগভালোবাসা হ্রাস পাচ্ছেবই পড়ারঅভ্যাস হারানোর কারণে বুদ্ধিবৃত্তিকনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে নাপ্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে তরুণ প্রজন্ম সাহিত্য থেকে সরেযাচ্ছে, যদিও বই পড়ার অভ্যাস মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকনৈতিকমানদণ্ড উন্নত করেআমাদের তরুণ প্রজন্মকে বই পড়ার প্রতিআগ্রহী করতে হবেপ্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাহিত্যের প্রসারে সাহায্য করতে পারেযেমন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তামানুষের পছন্দ অনুযায়ী বই সাজিয়ে দিতে পারে এবং টেক্সট-টু-স্পিচ প্রযুক্তি বইকে অডিওবুকে রূপান্তরিত করে যা দৃষ্টিশক্তিরকোনো সমস্যা বা সীমাবদ্ধতার কারণে যারা পড়তে পারে নাতাদের জন্য উপকারী এছাড়া, ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভার্চুয়ালবই ক্লাব এবং ফোরাম তৈরি করা যেতে পারে, যা পাঠকদের মধ্যেসাহিত্যচর্চা বৃদ্ধি করবে


আমাদের সাহিত্য, সংগীতশিল্পের অনেক উপকরণ আজবিলুপ্তির পথেআমাদের অবশ্যই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েচলতে হবে, কিন্তু একসঙ্গে সাহিত্যসংস্কৃতির সুরক্ষাপুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নিতে হবেশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেসাহিত্যচর্চার গুরুত্ব বাড়ানো উচিত, এবং শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচিরবাইরেও সাহিত্যের বই পড়তে উৎসাহিত করতে হবেসাহিত্যমেলা, বই মেলা, সাহিত্য ক্লাবপ্রতিযোগিতা আয়োজন করাযেতে পারেসরকারিভাবে স্কুলে ম্যাগাজিন প্রকাশ ও ই-বুকওয়েবসাইটের মাধ্যমে সাহিত্যচর্চা বৃদ্ধি করা যেতে পারেএতেআমাদের দেশ ভবিষ্যতে নতুন সাহিত্যিকদের খুঁজে পাবে

সাহিত্য কেবল বিনোদন নয়, এটি মানুষের মননচিন্তাভাবনারউন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেসাহিত্য আমাদেরকল্পনাশক্তি বৃদ্ধি করে এবং নতুন চিন্তাধারণা গঠনে সহায়তাকরেএটি সমাজের অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চাবিকাঠিআমাদের উচিত সাহিত্যচর্চাকে আরও প্রসারিত করা এবং নতুনপ্রজন্মের মধ্যে এর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা, যাতে আমরা একটিসমৃদ্ধশালী এবং মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি

বিজ্ঞাপন