বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন এবং মুজিববাদ


ঢাকা | Published: 2021-08-06 22:58:06 BdST | Updated: 2021-10-16 03:34:35 BdST

বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পঞ্চাশতম বছর এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পয়তাল্লিশতম বছর অতিবাহিত করছে। কিন্তু এখন প্রর্যন্ত "বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন এবং আদর্শ কি ছিলো" এটা নিয়ে তেমন গবেষণালব্ধ কোন গ্রন্থ চোখে পরেনি।

আমরা যারা তরুন প্রজন্ম; বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী,
আমাদের কারো প্রত্যক্ষ ভাবে বঙ্গবন্ধুকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আমরা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের পঠিত ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুকে জেনেছি তবুও আমাদের জানার সীমাবদ্ধতা আছে বলেই বোধ করি।

তাই আমাদের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন চেতনা এবং আদর্শ কি ছিলো? তা সহজ ভাষায় মূল্যায়ন করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। 

এই প্রজন্মের আমরা যারা আওয়ামী ভাব ধারাতে বিশ্বাসী, তারা প্রায়শই বিভিন্ন আড্ডা বা আলাপচারিতায় বলে থাকি "আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী"। এখান প্রশ্ন আসতেই পারে তাহলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শটা কি?

যেহেতু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তেমন কোন গবেষণালব্ধ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। কেবল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বহুবছর পরে তার তিনটি গ্রন্থের একটি " বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী" দ্বিতীয়টি "কারাগারে রোজনামোচা" ও সর্বশেষ গ্রন্থ "আমার দেখা নয়া চীন" প্রকাশিত হয়েছে।

এই গ্রন্থগুলি বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা ডাইরির ওপর ভিত্তি করেই অনূদিত হয়েছে। তাই আমাদের প্রজন্মের জন্য বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন এবং আদর্শ বোঝার জন্য একমাত্র অবলম্বন এই তিনটি গ্রন্থ।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারে রোজনামোচা এবং আমার দেখা নয়া চীন গ্রন্থ তিনটিতে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন ও অভিজ্ঞতার যে বিশদ বিবরন পাওয়া যায় তা থেকেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন এবং আদর্শ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

কারাগারের রোজনামোচা গ্রন্থটিতে ছেষট্টির ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধুর বন্দী জীবনের বিশদ বর্ননা পাওয়া যায়। তিনি এখানে গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

মুলত, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে কারাগারের অন্ধকারে অথবা ক্ষমতার বাহিরে। আবার তিনি তার রাজনৈতিক জীবনের বেশী সময় ব্যয় করেছেন বৃটিশ ঔপনিবেশিক এবং অগনতান্ত্রিক পশ্চিম পাক শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করে।

রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে বঙ্গবন্ধু একজন সাধারণ কর্মী ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার সাংগঠনিক দক্ষতা এবং অসাধারণ বাগ্মিতার কারণে অবিসংবাদিত নেতা'ই পরিনত হয়েছিলেন। সাংগঠনিক দক্ষতা সেই সাথে অসাধারণ বাগ্মিতা দুটি গুন একই সাথে পাওয়া রাজনীতিবিদ ইতিহাসে বিরল, তাই বলা চলে বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের একজন বিরল নেতা।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন শ্রেণী বৈষম্যের বিরুদ্ধে, তিনি ছাত্র অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের পক্ষে ছিলেন, তাদের আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়ে তার ছাত্রত্ব হারিয়ে ছিলেন। তার কাছে মুচি থেকে সমাজের উচু শ্রেণীর সকলেই সমান, বঙ্গবন্ধু চিরকাল শোষিতের পক্ষ লড়ে গেছেন।

তিনি তার ঐতিহাসিক এক বক্তৃতাতে বলেছেন পৃথীবিতে দুইটি শ্রেনী রয়েছে। একটি শোষক অন্যটি শোষিত, আমি শোষিতের পক্ষে। এই থেকেই বলা চলে তিনি সাম্যাবস্থায় বিশ্বাসী ছিলেন।

সত্তরের নির্বাচনের বিশাল বিজয় ছিলো বাঙালী জাতীয়তাবাদ নিশ্চিত করনের চূড়ান্ত ধাপ এবং পশ্চিমা শাষকগোষ্ঠির শোষনের বিরুদ্ধে চরম চপটাঘাত। বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ রাজনৈতিক দূরদর্শী নেতৃত্বের চূড়ান্ত চিহ্ন ছিলো এই ঐতিহাসিক ইলেকশন।

এখান থেকেই বাঙলীর জাতীয়তাবাদের চেতনা জাগ্রত হয় এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের পথে বলীয়ান হয় বাঙালী।

মুলত বঙ্গবন্ধুর এই ছড়িয়ে দেওয়া সমুন্নত জাতীয়তাবাদ বাঙালীর জাতীয়তাবাদের আকাঙ্খাকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তোলে।

১৯৭১ সালের ০৭ই মার্চের রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে বঙ্গবন্ধু এক ঐতিহাসিক বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এই বক্তব্যটি ইতিহাসের এক মহাকাব্য। তিনি তার এই বক্তৃতায় বলেন "ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার" মুসলমান ভাইয়েরা তার ধর্ম পালন করবে, হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে। কারো ধর্ম পালনে বাধা দেওয়ার অধিকার কারো নাই। এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্টই অনুমান করা যায় তিনি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার পরে, যুদ্ধ বিধস্ত বাংলাদেশে অরাজকতা সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ বিরোধী চক্রান্তকারীদের চক্রান্তে। এমন অরাজক পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করেন অরাজক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে।

তিনি ১৯৭৫ সালের ২৬শে মার্চ সোহারাওয়ার্দী উদ্যনে বাকশাল নিয়ে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রদত্ত ভাষণের বলেনঃ

আপনি চাকুরী করেন,
আপনের মাইনে দেই গরীব কৃষক, আপনের মাইনে দেই ঐ জমির শ্রমিক। আপনের সংসার চলে ঐ টাকায়, আমি গাড়ি চলি ঐ টাকায়! ওদের ইজ্জত করে কথা বলেন, ওরাই মালিক।

তিনি আরও বলেনঃ
সরকারী কর্মচারীদের বলবো, এটা বৃটিশ কলনী নয়
এটা পাকিস্তান কলনী নয় যে... যে লোকেরে দ্যখবা তোমার বাবার মতো, ভাইয়ের মতো তাদের সম্মান করবা কারণ ওরা নিজের কামাই খায়!

তিনি প্রশ্ন করেন মঞ্চের সামনে বসা শার্ট-প্যান্ট পরিহিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে।
তিনি বলেনঃ একটা কথা জিজ্ঞেস করি আপনাদের কাছে, মনে করবেন না কিছু।
আমাদের লেখা পড়া শিখাছে কে? ডাক্তার পাস করাইছে কে? ইঞ্জিনিয়ার বানাইছে কে?
আজ সাইন্স পাশ করায়ছে কে? আজ বৈজ্ঞনী বানাইছে কে? আজ অফিসার করে কে? কার টাকায়?
এই বাংলার দুঃখি মানুষের টাকায়...!

আপনাদের কাছে আমার জিজ্ঞেসা, আপনার লেখা পড়ার খরচ দিয়েছে শুধু আপনার সংসার দেখার জন্য নয়, ছেলে মেয়ে দেখার জন্য নয়। দিয়েছে তাদের আপনি কাজ করবেন, সেবা করবেন।

তাদের আপনি কি দিয়েছেন? কি ফেরত দিয়েছেন?
কতটুকু ফেরত দিয়েছেন? কার টাকায় ইঞ্জিনিয়ার সাব, কার টাকায় ডাক্তার সাব? কার টাকায় মেম্বার সাব? কার টাকায় সব সাব?! সবাই নষ্ট হয়ে গেছে, এই সমাজের মানুষদের আমি চরম ধাক্কা দিতে চাই।

বাকশাল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর এই বক্তৃতা থেকে বেশ বোঝা যায় যে তিনি সমাজের সকল স্তরের মানুষদের এক কাতারে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। তিনি সমাজতন্ত্রেও অবিচল ছিলেন।

মুলত বঙ্গবন্ধু গনতন্ত্র, সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্রের কোনো অংশকেই সম্পূর্ন রুপে গ্রহণ করেননি, তিনি এই রাজনৈতিক উপাদানগুলির থেকে ঠিক ততটুকুই নির্যাস নিয়েছিলেন যতটুকু নির্যাসের স্বাদ বাঙালীদের জন্য বাংলাদেশীদের জন্য মঙ্গলময় ও কল্যানকর।

তাই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনে ও আদর্শে নিঃসন্দেহে এক ভিন্ন সত্তা বিরাজমান। তাই রাজনীতিতে আমাদের প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও আদর্শ মানেই মুজিববাদ। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শের সমষ্টিগত নাম মুজিববাদ।

লেখকঃ মোঃ ফুয়াদ হাসান, উপ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ